সোহরাওয়ার্দীর এক কোণে একা বসে আছি। পাশেই একটা ছেলে আর একটা মেয়ে ভীষণ ঝগড়া করতেছিলো। ছেলেটা কাঁদছিলো আর চিল্লাচ্ছিলো এটা বলে যে, "অন্য কোথাও বিয়ে বসবি তো আমায় ভালোবাসছিলি কেনো? এতো কথা দিয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়ে ঠকাচ্ছিস কেনো এখন"।
মেয়েটা উত্তরে বললো, "এটা পরিস্থিতি, আমার কিছু করার নেই"।
ছেলেটা রিপ্লে দিলো, " আগে তো কসম করতি পরিস্থিতির দোহাই দিবি না"!
আমি সবটা শুনে তাদের কাছে গেলাম।
জিগ্যেস করলাম, "নাম কি"?
একজন বললো পূর্ণ আরেজন বললো আমি সমুদ্র।
আমি বললাম, "সমুদ্র শূন্য থাকলে মানায় না, পূর্ণতাতেই থাকুক"।
তারপর পকেট থেকে একটা এক হাজার টাকার নোট বের করে তাদের সামনে রাখলাম। দুইজনই খুব মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে আছে। মেয়েটাকে জিগ্যেস করলাম, এটার মূল্য কতো? মেয়েটা উত্তর দিলো, "পাগল-টাগল হইছেন নাকি? দেখাই তো যাচ্ছে, এক হাজার টাকা"।
আমি বললাম, এই একটা নোট আপনি যদি ওরে দিন, তাহলে এই টাকাটার মূল্য কতো?
মেয়েটা বললো, এক হাজার।
এবার প্রশ্ন করলাম, "এই টাকাটা দুজনকে দিলে এটার মূল্য কতো"?
এবার মেয়েটা বললো, পাঁচশো টাকা।
জিজ্ঞেস করলাম, তিনজনকে দিলে?
বললো, তিনশো তেত্রিশ টাকা।
তারপর বললাম, নিজেকে এমন করে ভাগ করবেন না, এক স্থানে রাখুন তাহলেই সঠিক মূল্যটা পাবেন।
তারপর মেয়েটা বললো, ভাইয়া ও তো আমার যোগ্য না।
উত্তর দিলাম, যোগ্যতাকে ভালোবাসলে আপনি ওর সাথে সম্পর্ক জড়িয়েছিলেন কেনো? আপনি হোয়াইট হাউজের চেয়ারটাকে আই লাভ ইউ বললেই পারতেন! আচ্ছা বাদ দিন। এবার পকেট থেকে এক টাকার একটা কয়েন বের করলাম। এবার বললাম, এটা কতো?
মেয়েটা বললো, এক টাকা।
আমি হাজার টাকার নোটটা আর এক টাকার কয়েনটা মেয়েটার সামনে রেখে বললাম, এখানে থেকে আপনি একটা নিবেন আর আমি একটা। মেয়েটা বললো, আমি তো চাইবো হাজার টাকাটা নিতে।
আমি হাসলাম, বললাম নিয়ে যান।
মেয়েটা বললো, আপনি হাসছেন! আপনার আফসোস হচ্ছে না? দুটোতে কতো তফাৎ জেনেও আপনি কয়েনটা নিবেন!
আমি বললাম, এই নোটটার সাথে এরকম আরও চারটা থাকলেও আমি এক টাকার কয়েনটাই নিতাম।
জিজ্ঞেস করলো, "কেনো"?
বললাম যে, এটা আমার লাকি কয়েন, আর স্পেশাল কিছুর মূল্য অন্য কোনোভাবেই হয় না। এখন আমি যদি ভাবতাম এই কয়েনটা আমার কাছে কিছুই না তাহলে আমিও হাজার টাকাটাই নিতাম আর বলতাম কয়েনটা আমার যোগ্য না, আমিও তফাৎ বলতাম। কিন্তু ওটাই আমার কাছে স্পেশাল। আর ওটার চাইতে এটাই কাছে রাখা সহজ, কারণ হাজার টাকার জন্য কেউ আমার গলায় ছুরিও ধরতে পারে কিন্তু এক টাকার জন্য, নো চান্স! খুব দামী কিছুর কাছে যেতে গেলে দেখবেন সেটা সাঁই করে অন্যের হাতে চলে গেছে।
মেয়েটা বললো, ভাইয়া বুঝে গেছি।
জিজ্ঞেস করলাম,"কী বুঝে গেলেন"?
স্পেশাল কিছুর যোগ্যতা লাগে না, আর কোনোভাবে মূল্যও হয় না।
এবার মেয়েটা যে ছেলেটার সাথে ঝগড়া করতেছিলো সে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে বললো, " চলো পালাবো, দূরে কোথাও চলে যাবো, দুনিয়ার আর কিছু লাগবো না আমার, মরণেও দিনও তুমি পাশে থাকবা, হ্যাঁ"?
এতোক্ষণ ছেলেটা চুপ করে দাঁড়িয়ে আমার কথা শুনতেছিলো, এবার সে আমায় জড়িয়ে ধরে বললো, ধন্যবাদ ভাই, আজীবন কৃতজ্ঞতা।
ওরা চলে যাচ্ছিলো, ডাক দিলাম।
জিজ্ঞেস করলাম, পালাবেন?
মেয়েটা বললো, হ্যাঁ।
বললাম যে, আমি কিন্তু বলেছি এই এক টাকার ওই কয়েনটার বিপরীতে আরও হাজার টাকার চারটা থাকলেও আমি ওটাই নিতাম। এই নিন আরও চারটা পাবেন, শোধ করে দিলাম।
বললো যে, ভাইয়া লাগবেনা, এমনিতে আপনার প্রতি কৃতজ্ঞ আজীবন।
বললাম রেখে দে বইন, দূরে যাচ্ছিস, কাজে লাগবে।
ওরা দুজনেই শব্দহীন কেঁদে দিলো।
যাওয়ার সময় মুচকি হেসে পিছনে তাকিয়ে শেষবার জিজ্ঞেস করলো, ভাইয়া বলেছিলে আরও চারটা থাকলে এটাই নিতা, তবে যদি নয়টা বা নিরান্নবইটা কিংবা নয়শো নিরানব্বইটা থাকতো?
উত্তর দিলাম, সেটা নেই আমার আপাতত আমার কাছে তাহলে সেগুলোর বিপরীতেও আমি আমার স্পেশাল লাকি কয়েনটাই চাইবো।
মেয়েটা বললো, ভাইয়া আমাদের কিন্তু আবার দেখা হবে একদিন, সেদিন তোমার কাছে নয়শো নিরানব্বইটা থাকবে তোমার বোন সে দোয়া রেখে যাচ্ছে, আর তোমার বোন কিন্তু তোমার কাছে লাকি কয়েনটা রেখে গেছে, মনে রাইখো।
মুচকি হাসলাম, ভালোবাসা সুন্দর, আমৃত্যু পাশে থাকাটা সুন্দর, আমার স্পেশাল কয়েনটার চেয়েও আরও অনেক অনেক বেশি দামী, সবচেয়ে দামী।
সমুদ্র আমায় জিজ্ঞেস করলো 'ভাইয়া আপনার নামটা'?
-মাহতাব।
তারপর পূর্ণ মেয়েটা আমায় জিগ্যেস করলো মাহতাব ভাইয়া আপনার কি কেউ আছে খুব স্পেশাল?
-আছে, ভীষণ স্পেশাল।
-নাম কি?
-অনিন্দিতা। (গম্ভীর স্বরে)
-সুন্দর নাম তো, নামের মতোই নিশ্চয় সে অনেক সুন্দর।
-কতোটা সুন্দর বর্ণনা করা মুশকিল, তবে প্রচন্ড মায়াবী যার চোখে তাকালে স্বয়ং সময় থেমে যায়। যার ললাটে তাকালে আকাশের নীলও ফ্যাকাসে লাগে। যার ঠোঁটে তাকালে পাহাড়ের সবুজ রঙ হারায়। যার চুলে তাকালে আকাশের মেঘ হাওয়া হয়ে যায়। আর যার পুরো মুখে দেখলে মনে হয় এই বুঝি চাঁদ জ্যোৎস্না ছড়ানো ছেড়ে দিয়ে অনিন্দিতাকে নিয়ে আকাশে বসিয়ে দিবে।
-বাহ অপরূপা।
এরপর যাওয়ার সময় সমুদ্র বললো ভাইয়া আপনার নাম্বারটা দিবেন? কখনও আবার সমস্যা হলে ডাকতে পারবো কি?
-অবশ্যই, নাও তাহলে।
সমুদ্র আর পূর্ণ চলে গেলো। পূর্ণতা বহাল থাকুক অনন্তকাল। ভালোবাসা দেখতেও সুন্দর।
ঠিক পরেরদিন সমুদ্র ফোন করলো। জানালো, 'ভাইয়া আমরা বিয়ে করেছি'।
-ভালো খবর। তা কোনো অসুবিধা?
-জ্বি ভাইয়া একটা অসুবিধা আছে।
-কি?
-বাসা খুঁজে পাচ্ছিনা। আর পূর্ণর বাবা আর ভাইয়েরা ওর ফোনে ম্যাসেজ দিছে। আমাদের পেলে টুকরো করে ফেলবে।
-এক্ষুণি সিম সব অফ করো, আমার ফেসবুক একাউন্ট দিচ্ছি, কারও থেকে কোনো একটা ওয়াইফাই নিয়ে কানেক্ট করে ওখানে নক করো আমায়।
-আচ্ছা ঠিকাছে ভাইয়া।
তারপর আমার একাউন্ট নিয়ে কিছুক্ষণ পর সমুদ্র আমায় ম্যাসেঞ্জারে নক করলো। আমি লোকেশনে গিয়ে দেখা করলাম। ওখান থেকে ওদের নিয়ে চলে গেলাম কুমিল্লার বুড়িচংয়ের ছয়গ্রাম এলাকায়। ভারতের বর্ডার ঘেষা গ্রাম। বাংলাদেশের শেষ সীমানার একটি স্থান। ওখানে আমার খুব পরিচিত একজন আছে বিডি ফুড কোম্পানির ডিস্ট্রিবিউটর। উনার কাছে গিয়ে সমুদ্রর জন্য মার্কেটিং এসআরের একটা চাকরি নিয়ে দিলাম। উনি বাসা ঠিক করে দিলো। চারদিক পাকা দালানের বর্ডারের ভেতরে উনার বড় ভাইয়ের একটা পাকা ভবন, বাইরে থেকে দেখতে পরিত্যক্ত ভূতের বাড়ির মতো হলেও ভেতরে মোটামুটি আভিজাত্যপূর্ণ। উনার বড় ভাইয়েরা এখানে থাকেনা, আসেও না, শহরে থাকে বহুবছর ধরে। তারপর ওদের সংসারের টুকিটাকি গুছানোর জন্য আমি আরও কিছু টাকা সমুদ্রের হাতে দিয়ে চলে আসি। আসার সময় দেখলাম ছেলেটা কৃতজ্ঞচিত্তে ছলছল চোখ নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
দুদিন পর থানা থেকে আমায় ফোন করে থানায় যেতে বলে। আমি যাই সেখানে। তারপর সমুদ্রের ব্যাপারে জিগ্যেস করে বলে ওদের ফোন সুইসড অফ হবার পূর্বে আপনার সাথে কথা হয়েছিলো, আপনি কিছু জানেন?
আমি না জানার ভঙ্গিমা করে বললাম, 'নাম্বারটা দেখি তো'।
নাম্বার দেখানোর পর আমি বললাম, "ও হ্যাঁ স্যার ওইদিন এই নাম্বারটা থেকে আমার ফোনে কল আসছিলো কিন্তু রং নাম্বার ছিলো, আমি চিনিনা পরে গালাগালি করে ফোন কেটে দিছিলাম"।
তারপর তারা আমায় জোরাজোরি করেনি, ছেড়ে দিয়েছিলো। কিন্তু পাশে দাঁড়ানো পূর্ণর বাবা আর ভাইয়েরা খুব জোর সন্দেহ করতে থাকে। থানা এরিয়া থেকে আমি বের হয়ে তিনটে মোড় ঘুরতেই দেখি পূর্ণর বাবা আর ভাইয়েরা আমার পথ আটকে দাঁড়ালো। আমি কিছু বলতে যাবো আগেই আমার মুখ বন্ধ করে বেঁধে পূর্ণর মেজো আংকেলের গাড়িতে তুলে আমায় নিয়ে গেলো একটা ভাঙ্গা বাড়িতে। ওখানে বেধে আমায় সিনেমাটিক স্টাইলে মারতে লাগলো আর বারবার জিগ্যেস করতেছিলো, 'যা জানিস বল'। আমি প্রতিবারই বলতে লাগলাম, "আমি কিছুই জানিনা"।
লাস্ট আমায় বাঁধা থেকে ছেড়ে দিলো। পরে আমি বললাম, "দেখেন আমি যা কিছু বুঝেছি, আপনারা মেয়ের জন্য অন্য কোনো ছেলে পছন্দ করলে সে যে ভালো হতো তার কোনো গ্যারান্টি আছে কি? মানুষ বাঁচেই বা কদিন আপনাদের মেয়ে যার সাথেই গেছে আপনাদের পছন্দ না হলেও মানুষটা তো তার নিজের পছন্দের, অপছন্দের কাউকে সাথে নিয়ে একটা জীবন জোর করে কাটাই দেওয়া পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জুলুম নয় কি?"
একথা শুনার পর পূর্ণর বড় ভাই বললো, "আমার বোন আর বোন জামাইকে তো আমরা ঠিকই মেনে নেবো, কিন্তু যদি কখনও জানতে পারি তুই কোনোভাবে জড়িত ছিলি তাহলে সেদিন তোর খবর করে ছাড়বো"।
এটা বলে ওরা চলে যায়, আমি রক্তাক্ত মুখ নিয়ে মুচকি হাসতে থাকি।
হঠাৎ ইশরাক থামিয়ে দিয়ে বললো মাহতাব ভাই আপনি কাহিনীতে আগে চলে গেছেন!
-কতো আগে?
-দুই বছর আগে। আপনি দুই হাজার বিশ সালে চলে গেছেন।
-আমার কোথায় থাকার কথা?
-ভাই অনিন্দিতায়, শুরু থেকে, আঠারো সালে।
চলবে...
গল্প- ডেথ_থেরাপি (১ম পর্ব)
লিখা- নিশান_হাসিব_শান্ত।
#লিখালিখি