# **আবু হুরায়রানামা**
(- ইতিহাস ও হাদিসগ্রন্থ থেকে)
আবু হুরায়রা হিজরতের সপ্তম বছরে ইয়েমেন থেকে মদিনায় এসে ইসলাম গ্রহণ করে। সে দুই বছরেরও কম সময় নবী মুহাম্মদের সান্নিধ্য পেয়েছিলো। অথচ এই দুই বছরের সান্নিধ্য থেকেই সে ৫০০০-এরও বেশি (সঠিকভাবে বললে ৫৩৭৪টি) হাদিস বর্ণনা করেছে! অন্যদিকে হাদিসের কিতাবগুলোতে আয়েশা, আবু বকর ও ওমর থেকে সম্মিলিতভাবে বর্ণিত হাদিসের সংখ্যা তার তুলনায় অনেক কম, অথচ তারা দীর্ঘদিন নবীর সঙ্গী ছিলেন। আবু হুরায়রার বর্ণিত অধিকাংশ হাদিসই "আহাদ", অর্থাৎ যেই হাদিসগুলো কেবলমাত্র সেই শুনেছে, আর কেউ শুনেনি! নবীর কিছু সাহাবী এবং আয়েশা, আবু হুরায়রার বিরুদ্ধে মিথ্যাচারের অভিযোগ এনেছিলেন যে, সে কেবল খ্যাতি অর্জনের জন্যই নবীর নামে হাদিস বানিয়ে বলতো। ইসলামের ২য় খলিফা হযরত ওমর তাকে হুমকি দিয়েছিলেন যে, যদি সে নবীর নামে হাদিস বলা বন্ধ না করে তবে তাকে দেশ থেকে বের করে দেওয়া হবে। ফলে হযরত ওমরের মৃত্যু পর্যন্ত আবু হুরায়রা চুপ ছিলো, কিন্তু পরবর্তীতে সে আবার হাদিস বর্ণনা শুরু করে। আবু হুরায়রা তৎকালীন উমাইয়া খলিফাদের খুশি করার জন্য হাদিস তৈরি করতো, যার মধ্যে সিরিয়ায় আমির মুয়াবিয়ার রাজপ্রাসাদে কাটানো সময়কালও অন্তর্ভুক্ত। আবু হুরায়রা তার শ্রোতাদের বলতো যে, সে এখন এমন সব হাদিস বর্ণনা করছে, যা ওমরের জীবদ্দশায় বললে তাকে চাবুক মারা হতো।
আবু জাফর আল-ইস্কাফি উল্লেখ করেছেন যে, খলিফা মুয়াবিয়া আবু হুরায়রাসহ কিছু লোককে নিয়োগ দিয়েছিলেন আলী ইবনে আবু তালিব (নবীর চাচাতো ভাই) সম্পর্কে বানোয়াট গল্প ও হাদিস প্রচার করার জন্য যাতে তাকে হেয় করা যায়। আবু হুরায়রা তখন মুয়াবিয়ার রাজপ্রাসাদে থাকতো এবং তার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলে সহায়তা করতো। কেবল মুয়াবিয়াকে খুশি করার জন্য সে এমন কিছু হাদিস তৈরি করেছিলেন যা আলী ইবনে আবু তালিবকে অপমান করে এবং আলীকে আবু বকর, ওমর ও ওসমানের চেয়ে নিম্নস্তরের হিসেবে চিত্রিত করে।
মুয়াবিয়া তার শাসনামলে আবু হুরায়রার সাহায্যে এমন অনেক হাদিস উদ্ভাবন করেছিলেন যেগুলো এই মতবাদ প্রচারে ব্যবহৃত হতো যে—ইমাম বা খলিফাকে আল্লাহ বা রাসুলের মতোই মেনে চলতে হবে।
আবু হুরায়রার বর্ণিত হাদিসগুলো অন্যান্য বহু হাদিসের সাথে সাংঘর্ষিক, এমনকি তার নিজের বর্ণিত অন্য হাদিসের সাথেও সাংঘর্ষিক। অন্যান্য বর্ণনাকারীদের বর্ণনা, কুরআনের আয়াত এবং মানুষের সাধারণ বিবেকের সাথেও তার হাদিস মিলে না।
আবু হুরায়রা ‘ক্বাব আল-আহবার’ নামক এক ব্যক্তি থেকে হাদিস বর্ণনা করতো।, এই ক্বাব আল-আহবার লোকটি ইহুদি থেকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলো। এই লোক ইহুদিদের ধর্মগ্রন্থ ব্যবহার করে কুরআনের ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করতো। সে এমন কিছু আপত্তিকর হাদিস তৈরি করেছিলো যেগুলো কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক এবং বিকৃত তাওরাতের মিথ্যা গল্প থেকে নেওয়া।
ইসলামি ঐতিহাসিকরা বলেন, আবু হুরায়রাকে বাহরাইনের গভর্নর করার দুই বছরের মধ্যেই সে প্রচুর সম্পদের মালিক বনে যায়। তখন খলিফা ওমর তাকে ডেকে পাঠান এবং বলেন, "হে আল্লাহর শত্রু, তুমি আল্লাহর সম্পদ চুরি করেছ। আমি যখন তোমাকে বাহরাইনের আমির বানিয়েছিলাম তখন তোমার পায়ে একজোড়া জুতাও ছিল না। এত সম্পদ (৪০০,০০০ দিরহাম) তুমি কোথায় পেলে?" কথিত আছে যে, হযরত ওমর তার কাছ থেকে ১০,০০০ দিরহাম কেড়ে নিয়েছিলেন (যদিও আবু হুরায়রা কেবল ২০,০০০ দিরহামের কথা স্বীকার করেছিলো)।
আবু হুরায়রা ছিলো বানোয়াট হাদিস ছড়ানোর অভিযোগে সবচেয়ে বেশি অভিযুক্ত ব্যক্তি। নবীর স্ত্রী আয়েশা সবসময়ই তার বিরুদ্ধে ভুল ও অসম্পূর্ণ গল্প বলার এবং এমন হাদিস তৈরি করার অভিযোগ আনতেন যা তিনি(আয়েশা) নিজে কখনো নবীকে বলতে শোনেননি। এছাড়াও তার হাদিসগুলো নারীদের প্রতি বিদ্বেষ আর কুকুরের প্রতি ঘৃণা ছড়ানোর জন্যও বেশ সমালোচিত। সে মুসলিম নারীদের অপমান করে এবং কুকুর মেরে ফেলার আহ্বান জানিয়ে অনেক হাদিস বর্ণনা করেছিলো।
# **আয়েশা ও আবু হুরায়রার দ্বন্দ্ব:**
ইবনে কুতাইবা আল-দিনোরি তার বিখ্যাত ইতিহাসগ্রন্থ "তাউয়িল মুখতালিফ আল-হাদিস"-এ বর্ণনা করেছেন: একবার নবীর স্ত্রী আয়েশা আবু হুরায়রাকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন, "তুমি নবী মুহাম্মদ সম্পর্কে এমন সব হাদিস বলো যা আমরা কখনো শুনিনি।" জবাবে আবু হুরায়রা বলেছিলো (বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী), "আপনিতো শুধু আপনার আয়না আর সাজগোজ নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন।" তখন আয়েশা রেগে গিয়ে বলেছিলেন, "বরং তুমিই তোমার পেট আর ক্ষুধা নিয়ে ব্যস্ত থাকতে। ক্ষুধার তাড়নায় তুমি অলিতে-গলিতে মানুষের কাছে খাবার ভিক্ষা করতে, আর মানুষ তোমাকে এড়িয়ে চলতো। শেষ পর্যন্ত তুমি ক্ষুধার জ্বালায় আমার ঘরের সামনে অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকতে আর মানুষ তোমাকে পাগল ভেবে তোমার ওপর দিয়ে হেঁটে চলে যেতো।"