এই ব্লগটি সন্ধান করুন

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

সোমবার, ১৩ জানুয়ারি, ২০২৫

হাওড়ায় এক বধূ এসেছিলেন যাঁর বাপের বাড়ি যশোরের পাঁজিয়া গ্ৰামে।

 হাওড়ায় এক বধূ এসেছিলেন যাঁর বাপের বাড়ি যশোরের পাঁজিয়া গ্ৰামে। ছেলে - মেয়ের বিয়ে হবে ,মেয়েরা স্বামীর ঘর করতে শ্বশুরবাড়ি যাবে চিরাচরিত এই রীতি বঙ্গ সংস্কৃতির অঙ্গ। অচিরেই হাওড়ায় আসা বউটি খুব খাতির- যত্ন পেতে লাগলেন যখন তিনি জানালেন  চিত্রতারকা ধীরাজ ভট্টাচার্য তাদের গাঁয়ের মানুষ। পাড়ার অন্য বউরা তাঁর কাছে জানতে চায় ও টুলুর মা তুমি ধীরাজ ভট্টাচার্য কে দেখেছো? বধূ হাসতে হাসতে বলে কেন দেখবো না,কতবার দেখেছি, আমাদের গ্ৰামের ছেলে তো। 

(ধ্রুবতারাদের খোঁজে ) 


একটা সময় নায়ক ধীরাজ ভট্টাচার্যের বিস্ময়কর জনপ্রিয়তা ছিল মেয়ে মহলে। তাঁর চেহারার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলতেন আহা যেন স্বয়ং কন্দর্প। যশোরের পাঁজিয়ায় ধীরাজ ভট্টাচার্যের সাধারণ একটা বাড়ি, কিন্তু এই সাধারণ ঘরের ছেলেটি শুধু সিনেয়ায় নয় সাহিত্যেও অসাধারণ হয়ে উঠেছিলেন। প্রতিবছর দুর্গাপুজোর সময় ধীরাজ কলকাতা থেকে তাঁর গাঁয়ের বাড়িতে যেতেন। গ্ৰাম জুড়ে পুজোর কদিন শুধু উৎসবের আমেজ। প্রতিদিন স্টেজ বেঁধে অভিনয় হবে। গৃহবধূরা সন্ধ্যার আগেই রান্না শেষ করে নেবেন। এই গ্ৰামের ছেলে ধীরাজ যে বহু বাঙালির হৃদয়ে বসত করে আছে সে অভিনয় করবে। অভিনেতা ধীরাজ ভট্টাচার্যের জীবনে সাহিত্যের ব্যাধি প্রবেশ করে। রসিক মানুষ,সাহিত্যেই যখন এলেন এত দেরিতে কেন? অনুজপ্রতিম সাহিত্যিকের প্রশ্নের জবাবে জানালেন রসকস যা ছিল টালিগঞ্জ সব নিঙড়ে বের করে নিয়েছে। ধীরাজ ভট্টাচার্য বাংলা সাহিত্যের সব্যসাচী লেখক প্রেমেন্দ্র মিত্রের বাড়ির সাহিত্যের আড্ডায় যেতেন শুধু নয় রসিয়ে রসিয়ে গল্প বলতেন।‌। প্রেমেন্দ্র সবার প্রিয় প্রেমেনদা। সেই সময়ে সিনেমা বা সাহিত্য  যারা উজ্জ্বল করেছেন অথবা উজ্জ্বল হয়েছেন তাদের সবাই প্রেমেন্দ্র মিত্রের বাড়ির আড্ডায় উপস্থিত হয়েছেন। ওই আড্ডার সঙ্গদোষে অভিনেতা ধীরাজ একদিন সাহিত্যিক হলেন।

(ধ্রুবতারাদের খোঁজে) 


যখন তাঁর লেখা ' যখন পুলিস ছিলাম ' দেশ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে বাঙালি পাঠক চমকে উঠলেন, এ কি! এ যে সেই সিনেমার ধীরাজ ভট্টাচার্য। তবু পাঠক দেখলেন জীবন সায়াহ্নে সিনেমার এক প্রবীণ অভিনেতা কি অপরূপ ভঙ্গিতে লিখেছেন। লিখেছেন ' যখন নায়ক ছিলাম '। অভিনেতা ধীরাজ সিনেমার পর্দায় প্রেমিকের চরিত্রে দিব্যি অভিনয় করেছেন আবার খলনায়কও হয়েছেন। বহুমুখী অভিনেতা,সুদর্শন চেহারা,একমাথা ঘন কোঁকড়ানো চুল,চাওনিতে মাদকতা। ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে ম্যাডান কোম্পানির নির্বাক ছবি ' সতীলক্ষ্মী'তে সুযোগ পেলেন। পিতৃদেব শিক্ষক মানুষ ছেলের অভিনয় মোটেও ভালচোখে নিলেন না। ধীরাজকে পুলিসের চাকরিতে যোগ দিতে হল। প্রথম পোস্টিং চট্টগ্রাম। তবে বেশিদিন চাকরি করতে পারলেন না। অন্য চাকরি খুঁজছেন,মনের মত কাজ না পেয়ে আবার সিনেমার জগৎকে বেছে নিতে হয়। নির্বাক ছবির পরে সবাক যুগে ধীরাজের প্রথম ছবি 'কৃষ্ণকান্তের উইল'। একবার দু্ঃখ করে বলেছিলেন  তারা যখন অভিনয় করেছেন তখন সিনেমা, অভিনেতা এসব মানুষ খুব ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখত না।অভিনয় করেন বলে কেউ বাড়ি ভাড়া দিতে চাইত না,পাড়ায় ঢুকলে অন্য বাড়ির জানালা বন্ধ হয়ে যেত।


অভিনেতা ধীরাজ,  শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় এর ছবি 'শহর থেকে দূরে ', 'মানে না মানা' ছবিতে রোমান্টিক নায়ক,প্রেমেন্দ্র মিত্রের ছবি 'নতুন খবর'এ  যশুরে ভাষার সংলাপে কামাল করেছেন। এরপর ' কালো ছায়া' ছবিতে খলনায়কের ভূমিকায় অভিনয়। ক্রমেই মরণের পরে,হানাবাড়ি,ডাকিনীর চর,রাত একটা, ধূমকেতু,এই সব ছিল তাঁর অভিনীত ছবি। ' আদর্শ হিন্দু হোটেল' নাটকে হাজারি ঠাকুরের চরিত্রে অসাধারণ অভিনয় করেছেন।  'বসুশ্রী'তে  দেখেছেন সত্যজিৎ রায়ের 'পথের পাঁচালী ' । অদ্ভুত ভাল লেগেছিল। উচ্ছ্বসিত হয়ে বাড়িতে অনুজ সাংবাদিক কে জরুরী তলব। বললেন এমন মরা ব্যাঙ,জলের ওপর পোকা -মাকড়ের খেলা,কাশবন,অনেক দূরে হারিয়ে যাওয়া রেলের লাইন সবকিছু যেন জীবন্ত।তার চেয়েও জীবন্ত ছবির মানুষগুলো। এতকাল সিনেমার পর্দায় সাজা -মানুষ দেখে এসেছি,নিজেও যা করেছি সব সাজা- মানুষ। এই 'পথের-পাঁচালী' ছবিটা দেখিয়ে দিল আমরা কত ব্যাক ডেটেড। 

(ধ্রুবতারাদের খোঁজে) 


একসময় লিভারের সিরোসিস ধরল ধীরাজকে। বিছানায় শুয়ে আছেন,হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রীটের বাড়িতে। কোথায় সেই কাঁচা সোনার মত রঙ। চামড়ার মধ্যে দিয়ে ঢাকা একটা কঙ্কাল, চুলগুলো রুক্ষ। একজন দুধ নিয়ে এসেছেন তাঁকে খাওয়ার অনুরোধ করছেন। ছেলেবেলার মত ধীরাজ বলছেন " এতটা আমি খেতে পারব না"। লোকটি বলছেন " মা বলেছেন খেতে"।  ও মা বলেছেন বাধ্য ছেলের মত ধীরাজ দুধগুলো চুমুক দিয়ে শেষ করলেন। চমৎকার এক দৃশ্য, অনাস্বাদিত প্রশাস্তি । মা- ছেলের এমন অনির্বচনীয় ভালবাসা বাঙলার ঘরে- ঘরে। জানালেন প্রতিদিন মা তাঁকে তিন সের দুধ খাওয়ান। খেতে হয়, কারণ মায়ের কষ্ট ছেলে হয়ে দেখতে পাবেন না। সেদিনও ছিল তাঁর বেঁচে থাকার উদগ্ৰ ইচ্ছে। মনে মনে বিশ্বাস করতেন তিনি আবার সুস্থ্য হবেন। বই লিখবেন, অভিনয় করবেন। বলেছিলেন সারাজীবন শুধু বঞ্চনা পেয়েছেন। অভিনেতা হিসেবে প্রশংসিত হওয়ার পরিবর্তে নিষ্ঠুর ভাবে সমালোচনা সহ্য করেছেন অনেক নিন্দুকের। আর লেখা! সে তো রটে গিয়েছিল কেউ নিশ্চিত লিখে দিয়েছে। নিন্দুকের তীর ছিল প্রেমেন্দ্র মিত্রের দিকে।  সেদিন বাংলা সাহিত্যের প্রথিতযশা সাহিত্যিক শংকরের সামনে চোখে জল ধীরাজের। বলেছিলেন ভাই সব সহ্য করতে পারি, কিন্তু বঞ্চনা বড় কষ্ট পেলাম। ১৯৫৯ এর মার্চের এক দিনলিপি। না এরপর পৃথিবীতে আর বেশিদিন লেখক, অভিনেতা ধীরাজ থাকেন নি। সব বঞ্চনা,সব নিন্দার উর্ধ্বে উঠে তিনি পাড়ি দিলেন তারাদের দেশে । সেখানেই ভাল থাকুন তিনি।

কলমে ✍🏻 অরুণাভ সেন।।

© ধ্রুবতারাদের খোঁজে


#DhirajBhattacharya

#Actor

#Author

#PatherPanchali 

#SatyajitRay 

#Tribute

#dhrubotaraderkhonje 

#Jessore

#harishchatterjeestreet 


পুস্তক ঋণ ও কৃতজ্ঞতা স্বীকার, চরণ ছুঁয়ে যাই,শংকর স্মৃতির সরণিতে বাংলা চলচ্চিত্রের অর্ধ শতাব্দী, সাতরঙ, রবি বসু

কোন মন্তব্য নেই:

নড়াইল জেলার  লোহাগড়ার ইতনার পরীর খাটের ইতিহাস ---

 নড়াইল জেলার  লোহাগড়ার ইতনার পরীর খাটের ইতিহাস --- পরীর খাটটি বাংলাদেশের জাদুঘরে দেখে থাকলেও ইতিহাস আমরা অনেকেই জানি না। নাটোরের মহারানী ভব...