(সত্য ঘটনা)
নিজের ছেলের জন্য পাত্রী দেখতে গিয়েছিলেন সতীশবাবু। সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন বন্ধু বরেণকেও। ফেরার পথে সেই কথাই দুই বন্ধুর মধ্যে আলোচনা হচ্ছিল আমার পিছনের সীটে বসেই।
হাওড়া থেকে বাসে উঠেছি আমি। যাদবপুর গামী এসি বাস।আমি ওঠার পরেই ওনারা উঠেই ঠিক আমার পিছনের সীটেই বসলেন। বয়স দুজনেরই ষাটোর্ধ্ব। আমি যাব ভবানীপুর।ওনাদের গন্তব্য আরো পরে। আমি নেমে আসার সময় দেখলাম সে গল্প তখনো চলছে, বুঝলাম ওনারা আরো দূরের যাত্রী। সে যাইহোক আসল গল্পে আসা যাক। বরেণ বাবু বসেই বিরক্ত হয়ে বললেন,
"দেখ সতীশ, আমি এরকম কথা কোনো মেয়ের মা'কেই বলতে শুনিনি। মেয়ের মা তো বলেই বসল,"ছেলের গায়ের রঙ ফর্সা তো? গায়ের রঙ কালো হলে আমি অন্তত মেয়ের বিয়ে দেব না।দেখলেন তো আমার মেয়ে কেমন টকটকে ফর্সা।" কথা গুলোর মধ্যে কেমন একটু বক্রোক্তিই ছিল। আচ্ছা তুই বল তো, গায়ের রঙ নিয়ে মেয়ের মায়ের এত অহংকার করার কি আছে? সাধারণত সবাই ছেলের ইনকামটাই দেখে। তোর ছেলে ব্যাঙ্কে চাকরি করে। যে কোনো মেয়ের বাবা মা রাজী হয়ে যাবে বিয়ে দিতে। এই বাজারে ভালো চাকরি করে, এমন একটা সৎ চরিত্রবান ছেলেকে কে না চায়? জানি ওনার মেয়েও চাকরি করে, তবুও। ছেলের গায়ের রঙ কালো বলে কেউ অপছন্দ করবে, অন্তত আমার জানা ছিল না। আর তোকেও বলিহারি! তোর মত হম্বিতম্বি ওয়ালা মানুষটাও মুখে কুলুপ এঁটে থাকল, একটি কথাও বললি না। তোর অন্তত কিছু বলা উচিত ছিল। এটা যদি আমার ছেলের দেখাশোনা হতো আমি কিন্তু দুটো কথা শুনিয়েই আসতাম। এরকম একটা ফ্যামিলিতে সম্বন্ধটা কে দেখে দিল বল তো? বিয়ের ব্যাপারে শুধু ছেলে মেয়ে দেখাটা শেষ কথা নয়, ফ্যামিলিটাও দেখতে হয়।
বরেণ বাবুর কথা শেষ হতেই মুখ খুললেন সতীশ বাবু। বললেন,
-জানিস বরেণ এই পৃথিবীটা যে গোল, তা আরো একবার প্রমাণ হয়ে গেল। সময়ের সাথে যেমন সব কিছু পরিবর্তন হয়ে যায়, তেমনি সময়ের সাথে সাথে হিসেবটাও বুঝিয়ে দেয় ভগবান। আমি বলতে চাইলেও বলার মত মুখ আমার ছিল না।তাই হয়তো চুপ ছিলাম। আমি তখন ভাবছিলাম মেয়ে দেখা হয়ে গেল অথচ মেয়ের মা কেন সামনে আসছে না, ব্যাপারটা আমার কাছে রহস্যময় মনে হচ্ছিল। শুধু মনে হচ্ছিল কিছু একটা ব্যাপার হয়তো আমার কাছে লুকিয়ে যাচ্ছে। আমার ধারণা ভুল বলে প্রমাণিত হল। আসলে আমরা যা ভাবি তা সব সময় সঠিক নয়। হঠাৎ করেই সে রহস্য ভেদ হয়ে গেল। একটা পুরানো হিসেব মিটিয়ে নিল আজ। বিশ্বাস কর বরেণ, আমি ওখানে মেয়েটির মা হিসেবে অনুলতাকে দেখব ভাবিনি।
-মানে?
-এই সেই অনুলতা আজ থেকে তিরিশ বছর আগে 'গায়ের রঙ কালো' এই অজুহাতে অনুলতাকে ছেড়ে দিয়ে বাড়ির পছন্দেই এক ফর্সা সুন্দরীকে বিয়ে করেছিলাম। অনুলতার কথা যখন বাড়িতে বলেছিলাম,তখন আমার বড় পিসিই বলে বসল, "কালো মেয়েকে বিয়ে করলে ওর পেটে যদি একটা কালো হয়?" আমার মা বলত, "ফরসা টুকটুকে বৌ না'হলে আমার সতুর সাথে মানাবে না।" অথচ আমার গায়ের রঙ কালো সেটা আমি নিজেই ভুলে গিয়েছিলাম। অদ্ভুত ব্যাপারটা কী হল বল তো, ফর্সা সুন্দরী মেয়েকে বিয়ে করেও আমার ছেলে মেয়েরা কিন্তু তাদের মায়ের মত ফর্সা হল না। অথচ অনুলতার এক মাত্র মেয়ে সে কিন্তু সত্যিই সুন্দরী। সেদিন বাড়ির পছন্দে বিয়ে করেছিলাম বলে সবাই বলেছিল,"এই না হ'লে ছেলে? এরকম ছেলে আজ কাল হয় না। বাবা মায়ের পছন্দতেই পছন্দ।" সেদিন নিজের মেরুদণ্ড সোজা রাখতে আমি পারিনি। আজ অনুলতার ওই একটি কথাই আমাকে অবশ করে দিল। আমি কোন মুখ নিয়ে কথা বলতাম ওখানে? ভগবান আসলে সব হিসেব ঠিক সময়ে বুঝিয়ে দেন বোধহয়। আমার ব্যক্তিত্ব সেদিনই ভেঙে গিয়েছিল যেদিন অনুলতাকে ছেড়ে দিয়ে বাড়ির পছন্দে বিয়ে করে নিয়েছিলাম। প্রশাসনিক পদের ভালো রাঙ্কে চাকরি করলেই কি ব্যক্তিত্বশালী হওয়া যায়? ওপর থেকে সাজানো সব কিছু আমাদের, কিন্তু ভিতরটা অন্য কথা বলে।ভুলটা আমিই করেছিলাম সেদিন, আর আজ অনু্লতা ভুল কিছু বলেও নি। মেরুদণ্ড সোজা থাকলে তো মুখের ওপর বলতে পারতাম। পাশার দান কখন যে উল্টে যাবে কেউ বলতে পারে না?
জানিনা তারপরে দুজনের মধ্যে কী কথা হয়েছিল। ঠিকই তো।ভগবানের হিসেব কখনো ভুল হয় না। সময়ের সাথে সাথে সব কিছু হিসেব পেয়ে যায় মানুষ, সে ভালো হোক বা মন্দ। বাস থেকে নামি আর ভাবতে থাকি, অন্যায় ভাবে কাউকে ছেড়ে দিলেও ঈশ্বর কখনো ছাড়েন না। দিনশেষে বিবেকের কাছে জবাব দিহি করতেই হবে। আর শেষ জবাবটা তো ঈশ্বর দেন। তার জন্য বোধহয় তৈরিও থাকতে হয়।
কলমে:সরজিৎ ঘোষ।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন