দশ বছরের এক কন্যাকে বিয়ে করে আনলেন চল্লিশ বছর বয়সী রায় চৌধুরী বাড়ির সেজো কর্তা সুশান্ত রায় চৌধুরী। চন্দ্রপুর জমিদার বাড়িতে আজ উৎসবের আবহ।জমিদার বাড়ির উঠোনে নানা মানুষের সমাগম। আলোকসজ্জায় সজ্জিত আজ রায়চৌধুরী বাড়ি।
বাল্য বিবাহ তখনো সমাজে অলঙ্ঘনীয় রীতি ছিল। কারণ যুগটা ছিল তখন আঠারোর দশক।
বর বরণ শেষে পালকি এসে থামল উত্তর প্রান্তের আঙিনায়।সুশান্ত রায় চৌধুরী, বয়স এখন তার চল্লিশ এর কোঠায়, এক পুত্র রয়েছে তার আগের পক্ষের স্ত্রী এর। সুশান্ত চৌধুরী বিবাহিত ছিলেন কিন্তু স্ত্রী তার মারা যান এক বৎসর হল। এই বিয়েতে তার কোনো প্রকার মত ছিল না।বিয়ে টা তিনি করেছেন সমাজ ও সংসারের চাপে। বাধ্য হয়েছেন দশ বৎসর বয়সী সুপ্রভা কে বিয়ে করতে। পুত্রের বয়স খুব একটা বেশি নয়।বলতে গেলে সুপ্রভার থেকে এক বছরের ছোটো।
সুপ্রভা হল অত্যন্ত গরিব ঘরের মেয়ে। জন্মের সময় মা মারা গেছেন।বাবাই একমাত্র ভরসা তার। একমাত্র কন্যাকে বড় করতে বিশাল হিমশিম খেতে হচ্ছিল সুপ্রভার বাবা হরিচরণ পালকে।তাই জমিদার বাড়ি থেকে যখন প্রস্তাব এল কন্যার জন্য তখন তিনি আর,বাঁধ সাধেন নি।বরং হাসি মুখে সেই প্রস্তাব মেনে নিয়েছেন।
সুপ্রভার ছোট্ট মুখ খানা বিশাল কাঁসার থালার আড়ালে ঢাকা পড়ে যায়। রায় চৌধুরী বাড়ির বড় বউ নতুন সেজো বউ কে বরণ করলেন। সুপ্রভার পরনে লাল রঙের কম দামী বেনারসি শাড়ি। গলায় একটা সামান্য সোনার সরু হার,কানে ছোট্ট ছোট্ট দু খান দুল। ছোট্ট মাথা টায় কালো সুবিশাল দীর্ঘ কেশ জট পাকিয়ে কোনোরকমে খোপা করে রাখা। মুখখানা একদম নিষ্পাপ,মায়া ভরা চাহনি তার। থাকবে নাই বা কেন সেই মায়া মানুষ টাই যে এখনো ঠিকমতো বেড়ে উঠে নি। খেলনা ধরার বয়সে সুপ্রভার হাতে শাখা পলা ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। পুতুল নিয়ে খেলা ছোট্ট মেয়ে টি এখন জমিদার বাড়ির সেজো বউ।
দুই জা মিলে সুপ্রভা কে সেজো দেবরের সুবিশাল বড়ো কক্ষে নিয়ে আসলেন। সুপ্রভা শুধু নিষ্পাপ চাহনি নিয়ে এদিক ওদিক পরখ করছিল। তার ছোট্ট মস্তিষ্কে এখনো কথাটা ঠিক মতো বসে নি যে সে এই বাড়ির বউ।
রায়চৌধুরীর বড়ো বউ জমিদার বাড়িরকত্রী এখন।শ্বশুর শাশুড়ি মারা গিয়েছেন।এরপর সব দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়েছেন বড়ো ছেলে মৃন্ময় রায়চৌধুরী আর বড়ো বউ কুমুদিনী রায়চৌধুরী । কুমুদিনী সুপ্রভার থেকে বয়সে অনেকটাই বড়ো। গুরুগম্ভীর তার চাল চলন।কিন্তু মন টা ভীষণ সরল তার। সুপ্রভা কে যে তার মনে ধরেছে ভীষণ, এটি তার চোখে মুখে প্রকাশ পাচ্ছে। অপর দিকে বাড়ি মেজো বউ রোহিণী সুপ্রভার প্রতি ভীষণ বিরক্ত।চোখে মুখে হাসি ফুটলেও মনে জ্বলছে তার হিংসার দাবানল। তার মতে "এক গরিবের মেয়ে কেন এই জমিদার বাড়ির বউ হবে?"
ভোর,তখন চারটা সুপ্রভা কে কক্ষে বিছানায় বসিয়ে রেখে দিয়ে দুই জা চলে গেলেন নিজেদের কক্ষে। ছোট্ট সুপ্রভা তখন কক্ষটিকে পর্যবেক্ষণ করতে ব্যস্ত। সুবিশাল কক্ষের ঠিক মাঝখানে বিছানা। দেয়াল ঘেঁষে একপাশে কাঠের টেবিল আর চেয়ার রাখা। টেবিলের উপর নানা ধরনের বই আর দোয়াত রাখা। বিছানায় রজনীগন্ধা আর গোলাপের ছড়াছড়ি। ডান পাশে বিশালাকার এক জানলা।জানলার বাইরে নয়ন খানি রাখলে সেই নয়নে দৃশ্যমান হয়ে উঠবে এক কৃষ্ণচূড়ার গাছ।আর তাতে বাসা বেঁধে রাখা পাখির সংসার।
সুপ্রভা এগিয়ে গেল গুটি গুটি পায়ে কাঠের টেবিলের নিকট। নিভু নিভু ল্যাম্পের বাতি জ্বলছে। সুপ্রভা টেবিলের বই গুলোকে একবার ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখল। মেয়েটির হঠাত্ চোখ পড়ল বিদ্যাসাগরের "নীতিমালা"র পাতায়। বইটি ছুঁয়ে দিতে যাবে তখনি দরজার ছিটকিনি বন্ধ হওয়ার শব্দ হল। সুপ্রভা হকচকিয়ে পেছনে ঘুরল। দেখতে পেল চল্লিশোর্ধ মানুষটি কক্ষে প্রবেশ করে দরজা ভিড়িয়ে দিচ্ছেন। সুশান্ত রায় চৌধুরী সুপ্রভাকে টেবিলের কাছে গুটিশুটি মেরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলেন। দীর্ঘশ্বাস ফেললেন তিনি তৎক্ষণাৎ। হাঁটুর বয়সী মেয়েকে তিনি স্ত্রী হিসেবে বাড়িতে নিয়ে এসেছেন। শিক্ষিত মানুষ তিনি অথচ চাপে পড়ে এত বড়ো ভুল করে বসেছেন। সুপ্রভা দু কদম পিছিয়ে গেল আর। কি আশ্চর্য!মেয়ে টা যাকে ভয় পাচ্ছে তার নামেই সে সিঁথিতে সিঁদুর পরেছে। এই সিঁদুর এর মর্ম যে কতখানি তা হয়তো এখনো বোধগম্য নয় সুপ্রভার।
সুশান্তর পরনে সাদা রঙের পাঞ্জাবী আর সাদা ধুতি। গলায় সোনার চেন চকচক করছে। বয়সের ছাপ মুখে স্পষ্ট উঠে এসেছে। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে সুপ্রভা কে কাছে ডাকলেন। সুপ্রভা দুদিকে মাথা নেড়ে জানান দিল নিঃশব্দে যে সে যাবে না।
সুশান্ত এবার গম্ভীর স্বরে ডাকলেন
- কিছু করব না।ভয় পেও না , আমি তোমার স্বামী।স্বামী কে ভয় পেতে নেই।
সুপ্রভা অস্ফুটস্বরে উচ্চারণ করল " স্বামী" ।এরপর ধীর পায়ে এগিয়ে আসল সুশান্তের নিকট। সুশান্ত উপর থেকে নীচ সুপ্রভা কে পর্যবেক্ষণ করে ফেলল। না চাইতেই চোখে মুখে ধীরে ধীরে লালসা ফুটে উঠল। বয়স্ক শরীর যৌবন ফিরে পেতে চাইল। সুশান্ত মুচকি হেসে সুপ্রভার হাত স্পর্শ করল।সুপ্রভা কিঞ্চিত কেঁপে উঠল। ভয়ে হাত টুকুন সরিয়ে ফেলল। সুশান্ত বেশ বিরক্ত হলেন। সুপ্রভা অস্ফুটস্বরে বলল
- আ..আমি বাবার কাছে যাব।
সুশান্ত কিঞ্চিত হেসে বলল
- তুমি এখন থেকে জমিদার বাড়ির সেজো বউ।বাবার সাথে তোমার এখন আর কোনোরকম সম্পর্ক নেই।এখন থেকে তোমার এটাই শেষ ঠিকানা। পুরোনো সব সম্পর্ক ভুলে মানিয়ে নিতে শেখো।
সুপ্রভা বোধ হয় কিছু বুঝতে পারল না। "মানিয়ে নিতে শেখো" কথাটা বারবার মস্তিষ্কে দোলা খাচ্ছে। সুপ্রভা বুঝতে পারল না কিছুই। বুঝতে পারল না এই কথাটা যে সে মেয়ে।আর এই সমাজে থাকতে হলে মুখ বুজে মেয়ে দের সব মানিয়ে নিতে হয়। চোখে বুজে দাঁত চেপে সব সহ্য করে নিতে হয়। সুপ্রভার বয়স এখন দশ। তাই এত কঠিন কঠিন কথা গুলোর মানে তার মস্তিষ্ক জানান দিতে পারছে না। সে অবুঝের মত বলল
- আচ্ছা আমার বাবা কোথায়? আমাকে বাবা নিতে আসবে না আর?
সুশান্ত এর মস্তিষ্কে ধীরে ধীরে ক্রোধ এর সঞ্চার ঘটে। খানিকটা উঁচু গলায় বলে
- দেখো মেয়ে।তুমি আমার স্ত্রী আজ থেকে।আর এই জমিদার বাড়ির সেজো বউ।তোমার উপর এখন সংসার আর,স্বামীর দায়িত্ব যা তোমাকে পালন করতে হবে। স্বামী আর সংসার সামলাতে হবে। তোমার বাবা তোমাকে আমার হাতে তুলে দিয়েছেন।বাবা হিসেবে ওনার দায়িত্ব এখানেই শেষ।এর পর থেকে আর বাবা বাবা করবে না।
সুপ্রভার বিস্ময়ে চোখ বড় হল। হৃদয় কেঁপে উঠল তার। নয়নে অশ্রু জমে উঠল। বলল
- এরকম টা হতে পারে না। আমি বাবার কাছে যাব।আমাকে দয়া করে ছেড়ে আসুন।
সুশান্ত সুপ্রভার হাত ধরে এক ঝটকায় তাকে মিশিয়ে ফেলল নিজের অঙ্গের সহিত। সুপ্রভা অস্বস্তি কর এই বাঁধন থেকে ছাড়া পাওয়ার জন্য ছটফট করতে লাগল।কিন্তু শক্ত পোক্ত শরীরে নিকট পেরে উঠল না। সুশান্ত বাতি নিভিয়ে দিল। সুপ্রভার ওপর,নিজের আধিপত্য বিস্তার করার প্রয়াস চালাল। সুপ্রভা এক পর্যায়ে কেঁদে ফেলে এবং হেচকি তুলতে তুলতে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। সুপ্রভার এহেন কান্ডে সুশান্ত নিজের,সম্বিত ফিরে পেল। তড়িঘড়ি দরজার ছিটকিনি খুলে কুমুদিনী ও রোহিণীকে ডেকে পাঠালেন দাসী কে দিয়ে।
চলবে...
-ভগ্ন_আসনে_বিরহ_বসন্ত
-সূচনাপর্ব
-অন্তরা_রায়
নেক্সট পার্ট গুলো সবার আগে নতুন পেজে দেয়া হবে নীল লেখায় চাপ দিয়ে নতুন পেজে ফলো করুন 👉 কাব্য-𝐄𝐱𝐭𝐫𝐚
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন