ভাবুন তো, এক বিকেলে আপনি বিশ্রাম নিচ্ছেন প্রশান্ত এক পরিবেশে। আগডুম বাগডুম অনেক ভাবনার মাঝে হঠাৎ চিন্তা ঘুরে যায় নিজের জীবনের দিকে — আপনার মা-বাবা, তাদের পরিশ্রম আর ভালোবাসা, যেগুলোর জন্য আপনি আজকের আপনি হয়েছো। তারপর চিন্তা চলে যায় আরও পেছনে — আপনার দাদা-দাদী বা নানা-নানীর দিকে। মনে পড়ে যায় তাদের মমতা, স্নেহ আর যত্ন। তারপর মনে হয়, তারাও তো কারও সন্তান ছিল, তাদেরও ছিল মা-বাবা, দাদা-দাদী... এভাবেই চলেছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। হঠাৎ মনে হয়, আমি তো এক দীর্ঘ, অবিচ্ছিন্ন ভালোবাসা, যত্ন আর ত্যাগের শৃঙ্খলের ফল। কত প্রপিতামহ-প্রমাতামহ ছিলেন আমার আগে — ভাবতেই অবাক লাগে।
আমার আসলে কতজন পূর্বপুরুষ আছে? এটা তো অসীম হতে পারে না, কারণ মানুষ প্রজাতি যখন প্রথম সৃষ্টি হয়েছিল, তখন নিশ্চয়ই তার একটি শুরু ছিল, তাই না?
পৃথিবীর সব মানুষ, দেখতে যতই আলাদা হোক না কেন, ভেতরে আমরা প্রায় হুবুহু একরকম। পৃথিবীর একদম দুই প্রান্তের একজন পুরুষ আর একজন নারীও একসাথে সন্তান জন্ম দিতে পারেন। তারা সেটা পারেন কারণ তারা একই প্রজাতির দুজন মানুষ। তাহলেতো আসলে আমরা সবাই আত্মীয়, যত দূরেরই হোক না কেন। অনেক দূর পেছনে গেলে দেখা যাবে আমাদের সবারই কোনো এক দাদা-দাদী বা নানা-নানী এক।
এই কৌতূহল থেকেই আসে প্রশ্নটা — তাহলে কি আমাদের সবার সাধারণ পূর্বপুরুষদের খুঁজে বের করা সম্ভব? ধর্মবিশ্বাসীরা হয়তো বলবেন, আমরাতো ইতিমধ্যেই জানি — আদম আর হাওয়া (Adam and Eve) আমাদের প্রথম পূর্বপুরুষ। কিন্তু ওটা বিশ্বাসের ব্যাপার। যদি আমরা প্রমাণ চাই — বিজ্ঞানভিত্তিক বা যুক্তিনির্ভর — তাহলে?
শুনতে অসম্ভব মনে হলেও, আশ্চর্যভাবে কিছু যৌক্তিক উপায় আছে যেগুলো দিয়ে আমরা একধরনের মোটামুটি অনুমান করতে পারি এ ব্যাপারে। এখানে খুব কঠিন কোন বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের কথা বলছি না, বরং পর্যবেক্ষিত কিছু সত্য মেনে নিয়ে যুক্তির ওপর যুক্তি দাঁড় করাবার কথা বলছি।
এই যুক্তি নির্ভর চিন্তাটা একটু এগিয়ে নিতে হলে আমাদের কিছু বৈজ্ঞানিক তথ্যের সাহায্য লাগবে — যেগুলো অনেকেই হয়তো জানেন না পুরোপুরি। চলেন, সেগুলো নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক।
প্রায় সব শিক্ষিত মানুষই জানে — DNA, জিন আর ক্রোমোজোম সম্পর্কে। DNA হলো সেই অণু যেটা ক্রোমোজোম তৈরি করে, আর জিন হলো DNA-র ছোট ছোট অংশ, যেখানে কোনো নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য বা জৈবিক কাজের নির্দেশনা লেখা থাকে।
প্রতিটি মানুষের কোষে থাকে ৪৬টি ক্রোমোজোম, ২৩ জোড়ায় সাজানো। প্রতিটা জোড়ার এক অংশ আসে মায়ের কাছ থেকে, আরেকটা বাবার কাছ থেকে। ২৩তম জোড়াটা ঠিক করে দেয় জীবের লিঙ্গ — মেয়েদের জন্য XX আর ছেলেদের জন্য XY। X ক্রোমোজোম আসে মার থেকে আর Y বাবার থেকে।
এখন, যদি আমরা জানতে চাই মানবজাতির সাধারণ পূর্বপুরুষ কে ছিলেন — বিশেষ করে আমাদের “প্রথম দাদা” — তাহলে কোন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি কাজে লাগানো যেতে পারে?
দুই বাবা-মাই তাঁদের DNA সন্তানকে দেন। কিন্তু ছেলেদের ক্ষেত্রে ২৩তম জোড়ার এক অংশ — Y ক্রোমোজোম — কেবল বাবার কাছ থেকেই আসে। এটা মায়ের DNA-র সঙ্গে মিশে না। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ছেলেরা বাবার কাছ থেকে এই Y ক্রোমোজোম প্রায় হুবহু অপরিবর্তিত অবস্থায় পায়।হ্যাঁ, সময়ের সঙ্গে ছোটখাটো পরিবর্তন বা মিউটেশন হয় — কিন্তু তাও খুবই সামান্য। তাই পৃথিবীর সব পুরুষের Y ক্রোমোজোম প্রায় একরকম, যেটা হাজার হাজার বছর ধরে পিতৃপরম্পরায় চলে এসেছে।
এখন একটু অন্য বিষয়ের কথা বলি — যদিও এটা আসলে আমাদের মূল আলোচনার সঙ্গেই যুক্ত।
ভাবুন, কেউ একটি পুরনো ছবি হাজারবার ফটোকপি করেছে। কিছু কপি আবার আগের কপি থেকে করা। পুরনো ছবিটাতে আগে থেকেই ছিল দাগ, ছোপ আর স্ক্র্যাচ। প্রতিবার ফটোকপি করলে কিছু নতুন দাগ যোগ হয়, কিছু আগের দাগ হারিয়ে যায় — তবুও ছবিটা মোটামুটি চিনে নেওয়া যায়।
এখন যদি আপনার হাতে সেই রকম একশোটা কপি দেওয়া হয় আর বলা হয়, বলো তো মূল ছবি থেকে এটি কয়বার কপি হয়েছে? প্রথমে শুনে অসম্ভব মনে হবে, কিন্তু আসলে পরিসংখ্যানভিত্তিক কিছু বিশ্লেষণ পদ্ধতি আছে যেগুলো দিয়ে আন্দাজ করা সম্ভব কত প্রজন্ম বা ধাপ পেরিয়ে এই কপিগুলো এসেছে।
একইভাবে, Y ক্রোমোজোমও বংশের পর বংশ কপি হয়ে আসছে। প্রতি প্রজন্মে ছেলেরা বাবার কাছ থেকে প্রায় হুবহু একটি কপি পায়, শুধু সামান্য মিউটেশন হয়।
যদি পৃথিবীর বেশ কিছু সংখ্যক পুরুষের Y ক্রোমোজোম সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করা যায়, তাহলে সেটাও অনেকটা সেই ফটোকপিগুলোর মতো একটি ডেটাসেট হবে। আর ঠিক তেমনি বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা হিসেব করতে পারেন কত প্রজন্ম আগে ছিল সেই সাধারণ পূর্বপুরুষ — “সব পুরুষের সাধারণ দাদা”।
এই ব্যক্তিকেই বিজ্ঞানীরা বলেন "Y-chromosomal Adam" — যিনি সব জীবিত পুরুষের পিতৃসূত্রে অভিন্ন পূর্বপুরুষ। তিনি পৃথিবীর প্রথম মানুষ ছিলেন না, কিন্তু সেই ব্যক্তি যার Y ক্রোমোজোম আজও সবার মধ্যে বিদ্যমান। অনুমান করা হয়, তিনি প্রায় ২ থেকে ৩ লক্ষ বছর আগে বেঁচে ছিলেন।
এখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে — তাহলে কি আমাদের একটি সাধারণ দাদী বা নানী আছে? উত্তরটা হলো, হ্যাঁ, আছে, তবে শুধু নানী। আর তাঁকে খুঁজে বের করাটা তুলনামূলকভাবে সহজ।
প্রতিটি সন্তান — ছেলে বা মেয়ে — একটি বিশেষ DNA পায়, যেটা কেবল মায়ের কাছ থেকে আসে। এই DNA কিন্তু আমাদের ৪৬টা ক্রোমোজোমের অংশ না। এটা থাকে কোষের এক বিশেষ অংশে, যেটার নাম মাইটোকন্ড্রিয়া (Mitochondria)।
মাইটোকন্ড্রিয়া হলো আমাদের কোষের পাওয়ারহাউস — এখানেই তৈরি হয় বেশিরভাগ শক্তি। মজার বিষয় হলো, পুরুষরা যতই শক্তি আর এনার্জি নিয়ে গর্ব করুক না কেন, আসলে সেই এনার্জির উৎসটা এসেছে মায়ের দিক থেকেই! অবশ্য, শক্তি বা মাংসপেশির জিনগত দিকটা আরও জটিল।
মাইটোকন্ড্রিয়ারও নিজের DNA আছে — যেটা কোষের মূল নিউক্লিয়াসের DNA থেকে আলাদা। এই মাইটোকন্ড্রিয়াল DNA (mtDNA) মায়ের কাছ থেকে সন্তানের মধ্যে যায় — ছেলে বা মেয়ে, দুইয়ের ক্ষেত্রেই।
এই mtDNA-র ছোট ছোট মিউটেশন বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা বের করেছেন, পৃথিবীর সব আধুনিক মানুষ এক সময় এক সাধারণ নারী পূর্বপুরুষের বংশধর। তিনি প্রায় দুই লক্ষ বছর আগে বেঁচে ছিলেন। এই নারীকে বিজ্ঞানীরা নাম দিয়েছেন — “মাইটোকন্ড্রিয়াল ইভ (Mitochondrial Eve)”।
তাহলে আমরা দুর অতীতের দাদা আর নানীর সন্ধান কিছুটা হলেও পেলাম। এদের দুজনেই খুব সম্ভবত বসবাস করতেন আফ্রিকা মহাদেশে। এখানে একটি কথা মনে রাখতে হবে, ওনাদের সাথে আমাদের রক্তের সম্পর্ক থাকলেও ওনারা কিন্ত একই সময়ে জীবিত ছিলেন না।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন