💧 জমজম: এক মায়ের তাওয়াক্কুল ও মরুভূমির বুকে রহমতের ঝরনা ✨
হাজার বছর আগে, আল্লাহর নির্দেশে হযরত ইব্রাহীম (আঃ) তাঁর স্ত্রী হাজেরা (আঃ) এবং দুগ্ধপোষ্য শিশু ইসমাঈল (আঃ)-কে এক নির্জন মরুপ্রান্তরে রেখে আসার সিদ্ধান্ত নিলেন। মক্কার সেই প্রান্তর তখন ছিল জনমানবহীন, ধূ ধূ বালু আর পাথুরে পাহাড়ের এক রুক্ষ ভূমি।
মরুভূমিতে নিঃসঙ্গতা ও পরীক্ষা
ইব্রাহীম (আঃ) যখন তাঁদের রেখে ফিরে যাচ্ছিলেন, হাজেরা (আঃ) ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “হে ইব্রাহীম! আপনি আমাদের এমন স্থানে রেখে কোথায় যাচ্ছেন যেখানে কোনো মানুষ নেই, কোনো খাবার নেই?” ইব্রাহীম (আঃ) নিশ্চুপ রইলেন। হাজেরা (আঃ) আবার জিজ্ঞেস করলেন, “আল্লাহ কি আপনাকে এই নির্দেশ দিয়েছেন?” ইব্রাহীম (আঃ) বললেন, “হ্যাঁ।” তখন ঈমানদীপ্ত কণ্ঠে হাজেরা (আঃ) বললেন:
“তবে আল্লাহ আমাদের ধ্বংস হতে দেবেন না।”
সাথে থাকা সামান্য পানি ও খাবার ফুরিয়ে গেলে তৃষ্ণায় কাতর হয়ে পড়ল ছোট্ট শিশু ইসমাঈল (আঃ)। সন্তানের ছটফটানি দেখে মা হাজেরা স্থির থাকতে পারলেন না।
সাফা-মারওয়ার সেই মরিয়া দৌড়
পানির খোঁজে মা হাজেরা (আঃ) প্রথমে সাফা পাহাড়ে উঠলেন, কিন্তু চারদিকে খাঁ খাঁ মরুভূমি ছাড়া কিছু দেখলেন না। এরপর তিনি উপত্যকা পার হয়ে মারওয়া পাহাড়ে ছুটলেন। কোথাও প্রাণের স্পন্দন নেই। সন্তানের ভালোবাসায় ব্যাকুল হয়ে তিনি এভাবে সাতবার সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মাঝে দৌড়ালেন। তাঁর চোখে ছিল জল, আর হৃদয়ে ছিল আল্লাহর ওপর অটল বিশ্বাস।
অলৌকিক ঝরনা: জমজম!
সপ্তমবার মারওয়া পাহাড়ে পৌঁছানোর পর তিনি একটি শব্দ শুনতে পেলেন। ফিরে এসে দেখলেন—যেখানে তৃষ্ণার্ত ইসমাঈল (আঃ) পা ছুড়ছিলেন, ঠিক তাঁর পদতলে বা জিবরাইল (আঃ)-এর আঘাতে মাটি চিরে পানির ধারা বের হয়ে আসছে!
বিস্মিত ও আনন্দিত হাজেরা (আঃ) পানির অপচয় রোধ করতে চারদিকে বালুর বাঁধ দিলেন এবং বললেন— “জমজম! জমজম!” (থামো, থামো!)। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) পরবর্তীতে বলেছিলেন, “আল্লাহ উম্মে ইসমাঈলের ওপর রহম করুন, তিনি যদি পানিটুকু ছেড়ে দিতেন তবে তা প্রবহমান নদীতে পরিণত হতো।”
আজীবন বরকতের উৎস
যেখানে এক ফোঁটা পানি ছিল না, সেখানে আল্লাহর কুদরতে জন্ম নিলো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কূপ। এই পানি পান করেই হাজেরা (আঃ) ও ইসমাঈল (আঃ) জীবন রক্ষা পেল। ধীরে ধীরে সেখানে বসতি গড়ে উঠল, যা আজকের পবিত্র মক্কা নগরী।
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:
“জমজমের পানি যে উদ্দেশ্যে পান করা হয়, আল্লাহ সে উদ্দেশ্য পূরণ করেন।” (ইবনে মাজাহ)
শিক্ষা:
১. তাওয়াক্কুল: আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা থাকলে মরুভূমির বুকেও রহমতের ঝরনা ধারা বয়ে আনা সম্ভব। ২. ধৈর্য ও সংগ্রাম: মা হাজেরা (আঃ)-এর সেই ত্যাগ ও সংগ্রামকে সম্মান জানাতেই আজ হাজীদের জন্য সাফা-মারওয়া 'সাঈ' করা ওয়াজিব করা হয়েছে। ৩. মায়ের ভালোবাসা: সন্তানের প্রতি মায়ের অকৃত্রিম আকুতি আল্লাহর আরশ কাঁপিয়ে দিতে পারে।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন