এই ব্লগটি সন্ধান করুন

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

বুধবার, ৮ জুলাই, ২০২৬

শেষ দশ সূরার গল্প — প্রতিদিন যা পড়ি, অথচ সুতোটা দেখি না ফেইসবুক থেকে নেওয়া

 শেষ দশ সূরার গল্প — প্রতিদিন যা পড়ি, অথচ সুতোটা দেখি না

---------------------------------------------------


সূরা ফীল থেকে সূরা নাস—কুরআনের শেষ দশটি সূরা আমাদের সবচেয়ে বেশি মুখস্থ। নামাজে ঘুরেফিরে এগুলোই পড়ি। কিন্তু কখনো কি খেয়াল করেছেন, এই দশটি সূরা আসলে একটাই গল্প বলছে—একটার পর একটা, নিখুঁত ধারাবাহিকতায়? আজ সেই সুতোটা ধরিয়ে দিচ্ছি। ইনশাআল্লাহ, এরপর থেকে এই সূরাগুলো তিলাওয়াতের অভিজ্ঞতাই বদলে যাবে।


পুরো গল্পটা বুঝতে আপনাকে শুধু একটা জিনিস মনে রাখতে হবে—ইবরাহীম (আ)-এর দুআ। কাবা নির্মাণের সময় তিনি মক্কার জন্য দুটি জিনিস চেয়েছিলেন: এই শহর যেন নিরাপদ থাকে, আর এর অধিবাসীরা যেন ফলমূলের রিজিক পায়। নিরাপত্তা এবং সমৃদ্ধি। ব্যস, এবার গল্প শুরু।


সূরা ফীল: আল্লাহ তাঁর প্রতিশ্রুতির প্রথম অংশ রক্ষা করলেন। হাতির বাহিনী নিয়ে আবরাহা এলো কাবা ধ্বংস করতে—আল্লাহ আবাবিল পাখি দিয়ে তাদের চিবানো ঘাসের মতো করে দিলেন। মক্কা রইলো নিরাপদ।


সূরা কুরাইশ: প্রতিশ্রুতির দ্বিতীয় অংশ। رِحْلَةَ الشِّتَاءِ وَالصَّيْفِ—শীত ও গ্রীষ্মের বাণিজ্য সফর। কুরাইশদের ব্যবসা চলে নির্বিঘ্নে, ক্ষুধায় তিনি খাদ্য দিলেন, ভয় থেকে দিলেন নিরাপত্তা। সমৃদ্ধিও পূর্ণ হলো। তাহলে দাঁড়ালো—ফীল ও কুরাইশ হলো ইবরাহীম (আ)-এর দুআর দুই ডানা।


সূরা মাউন: কিন্তু এবার প্রশ্ন—আল্লাহ তো তাঁর দিক থেকে প্রতিশ্রুতি রাখলেন; ইবরাহীমের যে সন্তানেরা এখন কাবার দায়িত্বে, তারা কি তাদের দিকটা রেখেছে? উত্তর: না।


أَرَأَيْتَ الَّذِي يُكَذِّبُ بِالدِّينِ ۝ فَذَلِكَ الَّذِي يَدُعُّ الْيَتِيمَ ۝ وَلَا يَحُضُّ عَلَى طَعَامِ الْمِسْكِينِ

আপনি কি তাকে দেখেছেন, যে দ্বীনকে অস্বীকার করে? সে-ই তো ইয়াতিমকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয়, আর মিসকিনকে খাবার দিতে উৎসাহিত করে না।


ইয়াতিমকে দূরে ঠেলে দেওয়া, লোক দেখানো নামাজ—এই হলো তাদের অবস্থা। সূরা মাউন যেন আদালতে পেশ করা প্রমাণ: কুরাইশরা ইবরাহীমের উত্তরাধিকারের যোগ্য নয়।


সূরা কাউসার: তারা যদি যোগ্য না হয়, তাহলে যোগ্য কে? উত্তর এলো—إِنَّا أَعْطَيْنَاكَ الْكَوْثَرَ—নিশ্চয়ই আমি আপনাকে কাউসার দান করেছি। কাবার প্রকৃত উত্তরাধিকারী হলেন রাসূলুল্লাহ (স)। কেন? কারণ তিনিই ইবরাহীম (আ)-এর আদর্শকে পুনরুজ্জীবিত করবেন। আর সেই আদর্শের সারকথা এই সূরাতেই: فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ—আপনার রবের জন্য নামাজ পড়ুন এবং কুরবানী করুন। নামাজ আর কুরবানী—ভেবে দেখুন, এই দুটোই তো ইবরাহীম (আ)-এর জীবনের সারমর্ম! যে কুরবানীর প্রস্তুতি তাঁকে এই ঘর নির্মাণের যোগ্য বানিয়েছিল, আর নির্মাণের সময় যাঁর দুআ ছিল—হে রব, আমাকে ও আমার বংশধরদের নামাজ প্রতিষ্ঠাকারী বানান।


সূরা কাফিরুন: এখন সমস্যা হলো, যোগ্য আর অযোগ্য—দুই পক্ষই এক শহরে, এক কাবা ঘিরে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে সবাই বুঝি একই ধর্মের। তাই এবার এলো প্রকাশ্য বিচ্ছেদের ঘোষণা:


قُلْ يَا أَيُّهَا الْكَافِرُونَ... لَكُمْ دِينُكُمْ وَلِيَ دِينِ

বলুন, হে কাফেরগণ... তোমাদের দ্বীন তোমাদের, আমার দ্বীন আমার।


উপাসনালয় এক হলেও ধর্ম এক নয়। আর সেই যুগে গোত্রের আনুগত্য ত্যাগ করার অর্থ কী জানেন? যে গোত্র আপনার নিরাপত্তার একমাত্র ঢাল, তাকেই প্রতিপক্ষ বানিয়ে ফেলা। কাফিরুন ঘোষণার পর সংঘাত অনিবার্য হয়ে গেলো।


সূরা নাসর: আর সংঘাত হলে কেউ জিতবে, কেউ হারবে। কে জিতবে? إِذَا جَاءَ نَصْرُ اللَّهِ وَالْفَتْحُ—যখন আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় আসবে... وَرَأَيْتَ النَّاسَ يَدْخُلُونَ فِي دِينِ اللَّهِ أَفْوَاجًا—আর আপনি দেখবেন, মানুষ দলে দলে আল্লাহর দ্বীনে প্রবেশ করছে। ভাবুন, এই প্রতিশ্রুতি যখন আসছে, মুসলিমরা তখন নির্যাতিত সংখ্যালঘু!


সূরা মাসাদ (আরেক নাম সূরা লাহাব): এত বড় প্রতিশ্রুতি বিশ্বাসযোগ্য করতে চাই একটা নমুনা, একটা টোকেন। যেমন টানা দশ ম্যাচ হারা দল একটা ম্যাচ জিতলেই বলে—"এখনো আশা আছে!" আল্লাহ সেই টোকেন দিলেন: تَبَّتْ يَدَا أَبِي لَهَبٍ وَتَبَّ—ধ্বংস হোক আবু লাহাবের দুই হাত। ইসলামের সবচেয়ে কঠিন শত্রুদের একজনের ধ্বংসের অগ্রিম ঘোষণা—প্রমাণ যে বড় বিজয়টাও আসছে।


সূরা ইখলাস: এবার এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক মুহূর্ত। বছরের পর বছর কোনো মিশনে লেগে থাকলে মানুষ কী ভুলে যায়? কেন শুরু করেছিল, সেটাই! বিজয়ের প্রতিশ্রুতি এসে গেছে; এখন মনে করিয়ে দেওয়া জরুরি—এই এত সংগ্রাম কীসের জন্য ছিল। ইবরাহীম (আ) কেন কাবা বানিয়েছিলেন? একটাই কারণে—


قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ ۝ اللَّهُ الصَّمَدُ ۝ لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ ۝ وَلَمْ يَكُنْ لَهُ كُفُوًا أَحَدٌ

বলুন, তিনিই আল্লাহ, এক ও অদ্বিতীয়। আল্লাহ অমুখাপেক্ষী। তিনি কাউকে জন্ম দেননি, তাঁকেও জন্ম দেওয়া হয়নি। আর তাঁর সমকক্ষ কেউই নেই।


মজার ব্যাপার কী জানেন? 'ইখলাস' শব্দটা এই সূরার কোথাও নেই! মাসাদে 'মাসাদ' আছে, কাফিরুনে 'কাফিরুন' আছে—কিন্তু ইখলাসে 'ইখলাস' নেই। তবু সাহাবিরা এই নাম দিলেন কেন? কারণ এই সূরা পুরো মিশনের নিয়তকে পরিশুদ্ধ করে দেয়—সবকিছু শুধুই এক আল্লাহর জন্য।


সূরা ফালাক ও সূরা নাস: কিন্তু এই যে ইখলাস—নিয়তের এই বিশুদ্ধতা—এটা কি একবার অর্জন করলেই চিরদিন টিকে থাকে? না; এটা সার্বক্ষণিক আক্রমণের মুখে থাকা এক অমূল্য সম্পদ। তাই গল্পের শেষে এলো দুটি সুরক্ষা-কবচ। বাইরের হুমকি থেকে—قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ الْفَلَقِ—রাতের অন্ধকার, জাদু, হিংসুকের হিংসা। আর ভেতরের হুমকি থেকে—قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ النَّاسِ—সেই কুমন্ত্রণাদাতা, যে মানুষের বুকের ভেতরে ফিসফিস করে। এত কষ্টে অর্জিত ঈমান আর ইখলাসকে এবার পাহারা দিন—বাইরে থেকে, ভেতর থেকে।


এবার পুরো গল্পটা এক নিঃশ্বাসে দেখুন: ইবরাহীমের দুআ পূর্ণ হলো (ফীল, কুরাইশ) → উত্তরাধিকারীরা অযোগ্য প্রমাণিত (মাউন) → প্রকৃত উত্তরাধিকারী ঘোষিত (কাউসার) → সম্পর্কচ্ছেদ (কাফিরুন) → বিজয়ের প্রতিশ্রুতি (নাসর) → বিজয়ের নমুনা (মাসাদ) → মিশনের মূল উদ্দেশ্য (ইখলাস) → সেই অর্জনের সুরক্ষা (ফালাক, নাস)।


আর সবচেয়ে সুন্দর কথাটা শেষে। কুরআন শুরু হয়েছিল এক প্রার্থনা দিয়ে—সূরা ফাতিহায় আমরা পথের দিশা চেয়েছিলাম। আর কুরআন শেষও হলো প্রার্থনা দিয়ে—ফালাক ও নাসে আমরা সেই পথের সম্পদটুকু হেফাজতের দুআ করছি। শুরুতে চাওয়া, শেষে পাহারা। আর নাস শেষ করে আমরা আবার কোথায় ফিরে যাই? ফাতিহায়। বৃত্তটা ঘুরতেই থাকে।


আল্লাহ আজ্জা ওয়া জাল্লা আমাদের কুরআনের উপর গভীর তাদাব্বুর করার এবং এর অপূর্ব বিন্যাসের স্বাদ আস্বাদনের তৌফিক দান করুন।


—নোমান আলী খান

— সূরাসমূহের পারস্পরিক সঙ্গতি বিষয়ক লেকচার থেকে

কোন মন্তব্য নেই:

শেষ দশ সূরার গল্প — প্রতিদিন যা পড়ি, অথচ সুতোটা দেখি না ফেইসবুক থেকে নেওয়া

 শেষ দশ সূরার গল্প — প্রতিদিন যা পড়ি, অথচ সুতোটা দেখি না --------------------------------------------------- সূরা ফীল থেকে সূরা নাস—কুরআনের...