পছন্দ করতেন অড়হর ডাল,সোনা মুগের ডাল। একসময় খুব মাংস খেতেন। মুরগি বেশ ভাল লাগত পরে গা সওয়া হয়ে গেল। মাছ বলতে পছন্দ শুধু ভাল ভেটকি আর রুই। সব্জি খেতে তেমন ইচ্ছে হত না অবশ্য কড়াইশুটি হলে আলাদা কথা। চায়ের সঙ্গে ওসব কেক - ফেক নয় হয় লঙ্কা মুড়ি না হলে চিঁড়ে ভাজা। সারাদিনে চার - পাঁচ কাপ চা লাগবে। ধোঁকার খুব বড় ভক্ত, কিন্তু খ্যাতির বিড়ম্বনায় জন্মদিনে ভক্তদের এড়াতে গৃহত্যাগ করে অজ্ঞাতবাস করতে হয়। তাই আক্ষেপ হোটেলে কে ধোঁকা নিয়ে যাবে! সত্যজিৎ রায়ের 'পথের পাঁচালী'র বিশ্বজয় মস্ত বড় ঘটনা। রবীন্দ্র পরবর্তী বাঙালির ইতিহাসে সে এক অবিস্মরণীয় ঘটনা। তারপর গঙ্গা দিয়ে কত জল বয়ে গেছে। জীবিতকালে নিজে হয়ে উঠেছিলেন কিংবদন্তি। চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ কোন ফাঁকে ফেলুদা, প্রফেসর শঙ্কুর অদ্বিতীয় স্রষ্টা হয়ে দাঁড়ালেন। নানা সাক্ষাৎকারে প্রাণ খুলে নিজের জীবনের অনেক কথা বলেছেন তার এক ঝলক ।
** লোকের মুখে এটা তো শুনি একমাত্র লোক আপনি যিনি ফোন এলে নিজে ধরেন,কেউ দেখা করতে এলে নিজেই এগিয়ে দরজা খুলে দেন।
উত্তর - না,সেটা করি। এবং এ ব্যাপারটায় পরিবর্তন ঘটানোর কোনও কারণ খুঁজে পাই নি। তাহলে আমাকে হঠাৎ উপলব্ধি করতে হয় যে আমি একটা কেউ কেটা হয়ে গেছি। কাজেই এবার থেকে আমি টেলিফোন ধরব না। কিন্তু এরকম উপলব্ধির জন্য চেষ্টা করার তো মানে হয় না।
** খ্যাতি এবং ব্যক্তি পুজোয় কেমন বোধ করেন?
উত্তর - একদিন প্রেসিডেন্সি কলেজের গায়ে বই কিনতে গিয়েছিলাম। ভিড় হয়ে গিয়েছিল। অসুবিধে আছে।
** ঋত্বিকের কাজ কেমন লাগে আপনার?
উত্তর - খুবই ভাল। ওঁর শরীর ভাল থাকত না। তাতেই যা করে গিয়েছেন - কি অসাধারণ। শরীর ভাল থাকলে আরও কত ভাল করতেন।
** মনের কথা বলতে রিলাক্স করতে কাকে খোঁজেন? বন্ধু নেই?
উত্তর - ছিল। ডেভিড ম্যাকাচিয়ন। মারা গেছেন। ২/৪ জন বন্ধু আছেন। তবে বেশিরভাগ আমার চেয়ে তরুণ বয়সী। নাম আর করলাম না। একবার প্রেসিডেন্সি কলেজের সহপাঠীরা একত্র হয়েছিলাম। সস্ত্রীক। স্ত্রীরা সবাই এক জায়গায় বসে। আমরা পুরুষেরা ছাত্রজীবনের কথা বলেই চলেছি। সে এক কাণ্ড। কলেজের সহপাঠীরা বুড়িয়ে গিয়েছেন।
** হ্যাঁ,আজ আমার শেষ প্রশ্ন,আজ পর্যন্ত পরপর অনেক ছবি করলেন, এখন যদি প্রশ্ন করা হয়, আপনার মতে কোনটা আপনার এক নম্বর ছবি, শ্রেষ্ঠ ছবি?
উত্তর - বাবা, ও বাবা সে আমি বলতে পারব না। সে কি কথা? তবে প্রথম ছবি হয়ত চারুলতাই হবে।
** প্রথম বড় লেখা কি? গদ্যে?
উত্তর - বড় লেখা তো আমার বাদশাহী আংটি, ফেলুদার উপন্যাস। বা ব্যোমযাত্রীর ডায়েরি। প্রফেসার শঙ্কুর উপন্যাস।
** ফেলুদাকে আপনি কিভাবে পেলেন? এটা খুব ছেলেমানুষী প্রশ্ন নয়। যখন আপনি ফিল্মে ডুবে আছেন,ছবি করছেন,ছবি আঁকছেন, সেই সময় ফেলুদা কোথা থেকে এলেন?
উত্তর - ফেলুদাকে পেলাম মানে, ডিটেকটিভ গল্প আমি চিরকালই পড়ে আসছি। ছাত্রাবস্থায় আমি প্রচুর ডিটেকটিভ গল্প পড়েছি। শার্লক হোমস তো আছেই,তা ছাড়াও অন্য অনেক ডিটেকটিভ উপন্যাস,গল্প সব বিলিতি।
'উদয়ের পথে' সাফল্যের পরে জ্যোতির্ময় রায় তাঁর পরবর্তী ছবিতে সত্যজিৎ রায় কে আর্ট - ডিরেক্টর হতে বলেছিলেন। পরে শুভো ঠাকুর তাঁর আর্ট ডিরেক্টর হলেন। ওঁর সহকারী হয়ে এলেন বংশী চন্দ্রগুপ্ত, যিনি পরে সত্যজিৎ রায়ের আমৃত্যু ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও বন্ধু ছিলেন। সত্যজিৎ রায় তখন কলকাতায় মা জননী সুপ্রভা দেবীর এক চেনা ভদ্রলোক তাঁর নাম ললিত মিত্র,মানিকবাবুর কমার্শিয়াল আর্টে আগ্ৰহ শুনে বললেন তা হলে সোজা রাসময় রোডে দিলীপ গুপ্তের বাড়িতে যাও। সে এক অভিজ্ঞতা। বাড়িতে ছিল পেল্লাই সাইজের এক অ্যালসেশিয়ান কুকুর। ডি কে কথা বলতে এলেন। হঠাৎ আবিষ্কার করলেন তিনি সুকুমার রায়ের ছেলে। চোখ গুলো চকচকে হল, বললেন বিজ্ঞাপনের নমুনা সহ দেখা করতে। সত্যজিৎ রায় একটা পারফিউমের বিজ্ঞাপন তৈরি করলেন উনি মানিক বাবু কে নিয়ে গেলেন ডি জে কিমার কোম্পানির ম্যানেজার মিস্টার ব্রুসের কাছে। তিনি বললেন " তুমি যা মাইনে পাবে ইট উইল ব্রেক ইওর হার্ট , রাজি আছো তো?
বেতন ৬৫ টাকা ১৫ টাকা ডি এ। ' পথের পাঁচালী'র পরে যখন ওই চাকরি ছাড়েন তখন মাইনে দু'হাজার টাকা।
** বাংলা খবরের কাগজ পড়েন?
উত্তর - বিশেষ নয়।
** টিভিতে খেলা দেখেন?
উত্তর - খেলা দেখি। টেনিস দেখি, ফুটবল, টেবিল টেনিস। ও বিষয়ে আমার উৎসাহ আছে।
** আপনি যে লিখতে পারতেন, কোনও শিক্ষক আপনাকে উৎসাহ দেন নি?
উত্তর -- হ্যাঁ, ইংরিজি আমি ভাল লিখতাম সে কথা আমার ইংরিজির দু- তিনজন প্রফেসর বলেছেন। সোমনাথ মৈত্র,তারাপদ মুখার্জি, সুবোধ সেনগুপ্ত এঁরা সবাই বলেছেন। সুবোধ সেনগুপ্ত তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন এইরকম যে " সত্যজিৎ ছেলেটা খুব ভাল লিখত, বেশ লেখার অভ্যাস ছিল। তা পরে শুনলাম সে নাকি film করছে। আমি মাথা চাপড়ালাম। তখন কি আর জানি Film করে সে এত নাম করবে "?
পুস্তক ঋণ ও কৃতজ্ঞতা স্বীকার, সত্যজিৎ রায় সাক্ষাৎকার সমগ্ৰ , সম্পাদক সন্দীপ রায়, সহযোগী সম্পাদক সোমনাথ রায়