॥ আমি যেন হই তোমার মাঝে ধন্য...॥
পর্ব - ১
সত্যিই তিনি ধন্য!
না, আমাদের পেয়ে নয়, আমাদের মতো অগুনতি গুনমুগ্ধ শ্রোতাদের হৃদয়ের মাঝে। আর আমরা ধন্য তাঁকে পেয়ে আমাদের মাঝে। স্বর্ণযুগের কিন্নরকণ্ঠী প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়। আজ তাঁর জন্মতিথি। বেঁচে থাকলে আজ তিনি ৯০ বছরে পদার্পণ করতেন। তবে তিনি বেঁচে আছেন, চিরকাল থাকবেন সঙ্গীতপ্রেমীদের হৃদয়ে।
তাঁর জীবনের গানগল্পে চিরশ্রী মজুমদারসসাগরা ভারতের গীতি-অধীশ্বরের এমন বিশাল সার্টিফিকেটের পরেও প্রতিমার দিকে প্রচারের সার্চলাইট ঘোরেনি! কিন্তু তাতে তাঁর প্রবাদ হয়ে ওঠা আটকাল কই?
এমন একটি বিপদসঙ্কুল প্রশ্নের উত্তর যে তিনি দেবেন, কেউ আশা করেননি। কিন্তু তিনি যে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। সঙ্গীতের মতোই তাঁর মনটাও আকাশসম বড়। তাই এক সাংবাদিক যখন তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন, গায়িকাদের মধ্যে কার গলাটি তাঁর সবচেয়ে সুরেলা লাগে, তিনি এক ঝটকায় বলে দিলেন, ‘‘প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়।’’ সাংবাদিক এ বার বিস্মিত, ‘লতা মঙ্গেশকর, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের চেয়ে আপনি প্রতিমাদিকে এগিয়ে রাখছেন!’ সোনা বাঁধানো স্বরযন্ত্রে হাসি আলতো ঢেউ তুলল। ‘‘প্রতিমার গানের কলি লতা নিজের বিশেষ সংগ্রহে রেখেছে। ওরা বলে, প্রতিমা মানুষই নয়। ও তো পাখি!’’
সসাগরা ভারতের গীতি-অধীশ্বরের এমন বিশাল সার্টিফিকেটের পরেও প্রতিমার দিকে প্রচারের সার্চলাইট ঘোরেনি! কিন্তু তাতে তাঁর প্রবাদ হয়ে ওঠা আটকাল কই? সে সময়ের দিকপাল গায়ক-গায়িকারাই জানিয়েছেন, ‘আটপৌরে চেহারা, কপালে টিপ, তাম্বুল রাঙা ঠোঁট, সাদামাঠা শাড়ির এই বঙ্গবালার খোলস দেখে তাকে সাধারণ ভেবো না, সে অনন্যা।’ তাঁর গান গাওয়া দেখতে এক সময়ে রেকর্ডিং রুমে হুড়োহুড়ি পড়ে যেত। হয়তো সে দিন তিনি রেডিয়োয় ‘অনুরোধের আসর’ মাতিয়ে দিচ্ছেন ছন্দে ভরাট ‘কঙ্কাবতীর কাঁকন বাজে ইছামতীর কূলে’ গেয়ে। মেলোডির মহারথী শ্যামল মিত্রের সুরের সে গানে প্রতিমার ছন্দতালে সকলে তো মন্ত্রমুগ্ধ। শুনলে মনে হয় ইছামতীর পাড়ে কোনও বালিকা যেন নাচতে নাচতেই গানখানি শোনাচ্ছেন। শ্রোতারা সব মাথা নেড়ে, তালি বাজিয়ে গানগল্পে মশগুল। কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, এমন সব কালজয়ী গান গাওয়ার সময়ে স্বয়ং প্রতিমা থাকতেন মূর্তিবৎ স্থির। তালের ওঠানামায় এতটুকু হাতের মুদ্রার ব্যবহার থাকত না, দুরূহ আবেগ ফোটাতে মুখের একটি রেখাও কাঁপত না। অদ্ভুত শান্ত-স্থিত ভাবেই নিখুঁত সুর বয়ন করে একেবারে সজীব করে তুলতেন সঙ্গীতকে। উদ্দেশ্য-বিধেয় পালটে, যেন ‘গুপি গাইন বাঘা বাইন’-এর সেই গানের ইন্দ্রজাল। প্রতিমার বেলায় সেই ছবির উলটপুরাণ। এখানে গানের মায়ায় মজে জগৎসার চোখ বুজে, মাথা দুলিয়ে তাল ঠুকে একশা। আর স্বয়ং গায়িকাই পাথর, স্থাণুবৎ। ও ভাবেই অবলীলায় সৃষ্টি করে চলেছেন তাঁর একান্ত নিজস্ব সাতরঙা গানের ভুবন। দেখেশুনে সকলের প্রশ্ন, এমন দক্ষতা তো সচরাচর দেখা যায় না! গানের মেজাজ ধরতে তাঁর কি প্রস্তুতি, আয়াস কিছুই লাগে না? গুপি-বাঘা তো জাদুক্ষমতা পেয়েছিল ভূতের রাজার বরে! প্রতিমা সেই মণিহার পেলেন কী করে? তারও জবাব দিয়ে গিয়েছেন হেমন্ত। ‘‘সে বাঁশরীকণ্ঠী। তাই সা থেকে সা তার চাইতে সুরে আর কেউ গাইতে পারে না!’’
গানের টানে তাঁর বাঁধা পড়া যে জন্মেরও বহু আগে! বাংলাদেশের বিক্রমপুর জেলার বাহেরক গ্রামের চট্টোপাধ্যায় পরিবারটি বরাবরই সঙ্গীতে অনুরক্ত। সেই পরিবারের ছেলে মণিভূষণ কলকাতার ‘কক্স অ্যান্ড কিং’-এ চাকরি করতেন, সপরিবার থাকতেন ভবানীপুরে। অসীম প্রতিভাধর মানুষ। বছর দুই ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের হয়ে ফুটবল খেলেছেন। অন্য দিকে গানের জন্য লোকে তাঁর নাম শুনলে মাথা আপনি নত করে। তিনি উস্তাদ বদল খানের শিষ্য অর্থাৎ পণ্ডিত ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়ের গুরুভাই। মণিভূষণ চট্টোপাধ্যায় গজল, ঠুমরি, দাদরায় ছিলেন ওস্তাদ। প্রতিমা যে বছর জন্মালেন, সেই ১৯৩৪-এই তাঁর গানের রেকর্ড বার হয়েছিল। অজয় ভট্টাচার্যের কথায় ও শচীন দেববর্মণের সুরে ‘যৌবনে হায় ফুলদলে পায়’, হিমাংশু দত্তের সুরে ‘স্বপনে কোন মায়াবী’। কিন্তু বিধি বাম! প্রস্ফুটিত হয়ে ওঠার সেই দিনগুলিতেই হঠাৎ মারা গেলেন মণিভূষণ। তখন তাঁর বয়স সবে সাতাশ। স্ত্রী কমলা আঠেরো। শিশু প্রতিমা তো মাত্র এক!
অনটন নেমে এসেছিল পরিবারে। কিন্তু কমলা কিছুতে ভেসে যেতে দিলেন না সংসার ও গীতবিতানকে। তাঁরই চেষ্টায়, উৎসাহে মণিভূষণের অকালে ফেলে যাওয়া গান কণ্ঠে তুলে নিলেন একরত্তি প্রতিমা। রোজকার খরচ থেকে বিন্দু বিন্দু করে টাকা বাঁচিয়ে তিনি মেয়েকে একটি হারমোনিয়ামও কিনে দিলেন। গুণবতী কমলা প্রথম দিকে নিজেই মেয়েকে গান শেখাতেন। পরে তাকে নিয়ে গেলেন প্রকাশকালী ঘোষালের কাছে। খুকির কচি গলার দু’কলি শুনে দারুণ খুশি প্রকাশকালী। বললেন, ‘গান এর রক্তে!’ প্রকাশকালী নিজের সবটা উজাড় করে প্রতিমাকে সঙ্গীতের পাঠ দিয়েছিলেন। ছাত্রীভাগ্যে আত্মহারা হয়ে মেয়েটিকে নিয়ে গিয়েছিলেন নিজগুরু ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়ের কাছে। প্রতিমা কিছু দিন ভীষ্মদেবের সঙ্গও করেছেন। সেই শৈশবে ছুটিতে এক বার ঢাকায় আত্মীয়বাড়ি গিয়েছেন, আশপাশের লোকজন তাঁর গান শুনে তাজ্জব। এক গুণগ্রাহী ঢাকা রেডিয়োয় যোগাযোগ করিয়ে দিলেন। সেখানে শিশুবিভাগে গাইবার পরপরই ডাক এল কলকাতা বেতার থেকে। মাত্র এগারো বছর বয়সে ১৯৪৫-এ সেনোলা থেকে প্রথম রেকর্ড বেরিয়ে গেল ‘কুমারী প্রতিমা চ্যাটার্জী’ নামে। সুকৃতি সেনের কথা ও সুরে বেসিক গানের রেকর্ড। ‘প্রিয় খুলে রেখো বাতায়ন’, ‘মালাখানি দিয়ে আমারে ভোলাতে চাও’ গানগুলি বেশ জনপ্রিয় হল। জলসায় গান শুনেই বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এলেন সঙ্গীতপ্রেমিক অমিয় বন্দ্যোপাধ্যায়। সম্ভ্রান্ত পরিবারের সুদর্শন যুবক। কমলাদেবীকে প্রতিশ্রুতি দিলেন, গানের জগতে প্রতিমাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে যথাসাধ্য করবেন। তেরো পেরোতে না পেরোতেই স্বামীঘর করতে নবপরিণীতা প্রতিমা চলে এলেন টালিগঞ্জের সাহানগরে। সেখানেই তাঁর সন্তানদের জন্ম। এক মেয়ে, তার পরে ছেলে।
সেই সময়ে দক্ষিণ কলকাতার মিলনচক্র ক্লাবে প্রতি মাসে ঘরোয়া অনুষ্ঠান হত। সেখানে গান শুনতে আসতেন নক্ষত্রেরা। ঊষারঞ্জন মুখোপাধ্যায়, শৈলেন মুখোপাধ্যায়রা ছিলেন নিয়মিত মুখ। একদিন দর্শকাসনে বসে ছিলেন গায়ক-সুরকার ও শিল্পীস্রষ্টা সুধীরলাল চক্রবর্তী, যিনি শ্যামল মিত্র, উৎপলা সেন, নীতা সেন প্রমুখ অগণিত শিল্পীকে তালিম দিয়েছিলেন। প্রতিমার গায়কিতে তিনিও চমৎকৃত। সেই যোগাযোগের ফুল ফুটল আরও দু’বছর পার করে। ১৯৫১-য় ‘সুনন্দার বিয়ে’তে প্রথম বার সুরারোপ করলেন সুধীরলাল। তাঁর ডাকেই ‘উছল তটিনী আমি সুদূরের চাঁদ’ গানে নেপথ্যগায়িকা রূপে আত্মপ্রকাশ করলেন প্রতিমা। গান শুনে অন্য সুরকাররাও প্রতিমার খোঁজ করতে শুরু করলেন। তবে প্রতিমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিল পিনাকী মুখোপাধ্যায়ের ‘ঢুলি’ ছবিটি। ১৯৫৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘ঢুলি’ ছিল তখনকার দিনের মাল্টিস্টারার, মিউজ়িক্যালি হিট ছায়াছবি। ছবি বিশ্বাস, সুচিত্রা সেন, অনিল চট্টোপাধ্যায়, মালা সিনহার অভিনয়ে ঋদ্ধ এই ছবিটি ‘পথের পাঁচালী’রও আগে বাঙালি গ্রামের নিসর্গ ও জীবনযাত্রাকে নায়কের আসনে বসিয়েছিল। সেই ছবির টিকিট কাটতে যে দীর্ঘ লাইন পড়ত, তারই দর্শক মোহাবিষ্টের মতো সিনেমাশেষে বেরিয়ে আসতেন রাজেন সরকারের সুরে অনবদ্য গানগুলি গাইতে গাইতে। ‘ঢুলি’র রেকর্ড বিকিয়েছিল মুড়ি-মুড়কির মতো। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য, যূথিকা রায়ের মতো বাঘা শিল্পীর পাশে চমকে দিলেন প্রতিমা। ডুয়েট ‘চুপি চুপি এল কে’ গানে পাতিয়ালা ঘরানার ওস্তাদ গাইয়ে প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে সমানে পাল্লা দিলেন এই নবীনা। আর নিজের জাত চিনিয়ে দিলেন ‘নিঙাড়িয়া নীল শাড়ি শ্রীমতী চলে’ গানটিতে। মালা সিনহার লিপে এই গানে প্রতিমা তাঁর রাগের যে ছোট ছোট ঘূর্ণন তুলেছিলেন, তা শুনে ছিটকে গিয়েছিলেন হেমন্ত। তাঁর অস্ফুট জিজ্ঞাসারই প্রতিধ্বনি উঠেছিল সেই সময়ের তাবড় সঙ্গীতকুলে। এই শ্রীকণ্ঠী কে?
(পরবর্তী পর্ব কিছুক্ষণ পরেই পোস্ট করা হবে)
_______________________________________
তথ্য ও চিত্র সৌজন্যে: আনন্দবাজার অনলাইন।
সম্পাদনা ও চিত্র রঙিনীকরন: কিছু কথা ॥ কিছু সুর।
#PratimaBandopadhyay #hemantamukherjee #HemantaMukhopadhyay #kichukothakichusur
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন