সমতল পৃষ্ঠের বাইরে মহাবিশ্বে ত্রিভুজের তিন কোনের সমষ্টি ১৮০° নয়!
স্কুলজীবনে আমরা সবাই পড়েছি যে যেকোনো ত্রিভুজের তিন কোণের সমষ্টি সর্বদা ১৮০°। খাতার সমতল পাতা কিংবা ক্লাসরুমের বোর্ডের জন্য এই হিসাবটি একদম সঠিক। কিন্তু আপনি যদি এই সমতল পৃষ্ঠের বাইরে মহাবিশ্বের অন্যসব স্থানে যান, তবে দেখতে পাবেন প্রকৃতির নিজস্ব জ্যামিতিতে এই সরল নিয়মটি আর খাটে না। মহাকাশে তিনটি বিন্দুর মধ্যে আলোর পথ ধরে যদি একটি তাত্ত্বিক ত্রিভুজ কল্পনা করা হয়, তবে তার তিন কোণের যোগফল ১৮০° এর চেয়ে বেশি কিংবা কম হতে পারে!
প্রশ্ন হলো কেন এমনটা ঘটে?
আমরা সমতল খাতায় যে জ্যামিতি আঁকি তাকে ইউক্লিডীয় জ্যামিতি বলা হয়। গ্রিক গণিতবিদ ইউক্লিড প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে এর ভিত্তি তৈরি করেছিলেন। কিন্তু আমাদের মহাবিশ্বের স্থান-কাল বা স্পেস-টাইম কোনো সমতল কাগজের মতো নয়।
সূর্য বা পৃথিবীর মতো ভারী বস্তুগুলো তাদের বিশাল ভরের (Mass) কারণে চারপাশের স্পেস-টাইমকে বাঁকিয়ে দেয়, ঠিক যেমন একটি ভারী বল ফোমের তোশকের ওপর রাখলে তোশকটি দেবে যায়। আর আলো সবসময় এই বাঁকানো স্পেস-টাইমের ভেতর দিয়ে সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত সোজা পথে (জিওডেসিক) চলতে চেষ্টা করে। ফলে বাঁকানো স্পেস-টাইমের ভেতর আলোর চলার পথটিও বেঁকে যায় এবং সেই পথ দিয়ে গঠিত ত্রিভুজের তিন কোণের সমষ্টি আর ১৮০ ডিগ্রি থাকে না।
পক্ষান্তরে, যেখানে স্থান-কাল একদম সমতল বা বাঁকানো নয়, সেখানে আলো সম্পূর্ণ সোজা রেখা অনুসরণ করে চলে। ফলে সেই অঞ্চলে আলো দিয়ে গঠিত ত্রিভুজের তিন কোণের সমষ্টি ঠিক ১৮০ ডিগ্রি। তাত্ত্বিকভাবে, কোনো ভারী নক্ষত্র বা মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের প্রভাবহীন সমতল ৪D স্থান-কালে (যাকে Minkowski Spacetime বলা হয়) আলো দিয়ে তাত্ত্বিক ত্রিভুজ আঁকলে তিন কোণের যোগফল নিখুঁতভাবে ১৮০ ডিগ্রিই হতো।
কিন্তু প্রশ্ন হলো - মহাশূন্যে এমন কোনো স্থান কি বাস্তবে আছে যেখানে কোনো ভারী নক্ষত্র, গ্রহ বা মহাকর্ষের প্রভাব একেবারেই নেই?
উত্তর হলো, বাস্তব মহাবিশ্বে সম্পূর্ণ মহাকর্ষহীন কোনো স্থান নেই। মহাবিশ্বের সবচেয়ে ফাঁকা জায়গা, যাকে মহাজাগতিক শূন্যতা বা কসমিক ভয়েড (Cosmic Void) বলা হয়, সেখানেও দূর-দূরান্তের ছায়াপথ বা পদার্থের অতিসূক্ষ্ম হলেও মহাকর্ষীয় প্রভাব বিদ্যমান থাকে।
যেহেতু পুরো মহাবিশ্ব জুড়ে আদর্শ মিনকভস্কি স্পেস-টাইমের কোনো বৈশ্বিক অস্তিত্ব নেই, তাই স্থানীয় স্কেলে গ্রহ-নক্ষত্রের মহাকর্ষীয় প্রভাবে আলোর পথ কিছুটা হলেও বেঁকে যায়। ফলে স্থান-কালের সেই বক্রতায় আলো দিয়ে আঁকা ত্রিভুজের কোণ আর সাধারণ ১৮০ ডিগ্রির মাপে স্থির থাকে না।
সুতরাং খাতার পাতায় যা পরম সত্য, মহাশূন্যের বাঁকানো স্থান-কালে তা কেবল একটি বিশেষ নিয়ম মাত্র। মহাবিশ্বের আসল জ্যামিতি নির্ধারিত হয় স্থান-কালের বক্রতা এবং আলোর জিওডেসিক পথ দিয়ে।
*** এই বিষয়ে অধিকতর জানতে কমেন্টে শেয়ারকৃত তথ্যসূত্র পড়ুন।
#DiscoverwithMainul #spacetime #spacetimecontinuum #geometry #euclid #trigonometry #মহাবিশ্ব #মহাকাশ #জ্যামিতি
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন