পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের নামকরণ, তাৎপর্য, বৈজ্ঞানিক ও আধ্যাত্মিক উপকারিতা এবং করণীয়।
আসুন কুরআন এবং হাদিসের আলোকে জেনে নেই।
১। সালাতুল ফজর।
০০ নামের রহস্য :
০ 'ফজর' শব্দের অর্থ "ভোর" বা "প্রভাত"।
০ রাত্রির অন্ধকার ভেদ করে যখন আলো স্ফুরিত হয়, তখন এই সালাত আদায় করা হয় বলে একে ফজর বলা হয়।
০০ তাৎপর্য :
০০ আল কুরআন :
০ আল কুরআনে এই ওয়াক্তের গুরুত্ব সম্পর্কে বলা হয়েছে, "নিশ্চয়ই ভোরের সালাতে ফেরেশতাদের সমাবেশ ঘটে।" (সূরা বনি ইসরাইল: ৭৮)।
০০ হাদিস :
০ হাদিস অনুযায়ী, ভোরের বায়ু ও সালাত বান্দার আত্মিক জাগরণ ঘটায় এবং সে আল্লাহর হেফাজতে থাকে। (সহিহ মুসলিম: ৬৫৭)।
০০ উপকারিতা :
০ শারীরিক : ভোরে বাতাসে ওজোনের মাত্রা বেশি থাকে যা রক্তসঞ্চালন বৃদ্ধি করে, মানসিক বিষণ্নতা দূর করে এবং হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়।
০ আত্মিক : শয়তানের বাঁধন ছিন্ন করে মনে প্রশান্তি ও কর্মোদ্যম ফিরিয়ে আনে।
০০ করণীয় :
০ আজান শুনে ঘুম থেকে জেগে মেসওয়াক করা, অজু করে দুই রাকাত সুন্নত সালাত আদায় করা।
০ এরপর জামাতে দুই রাকাত ফরজ আদায় করা।
২। সালাতুল জোহর।
০০ নামের রহস্য :
০ 'জোহর' শব্দের অর্থ "মধ্যাহ্ন" বা "প্রকাশ্য"।
০ সূর্য যখন মাথার ওপর থেকে কিছুটা পশ্চিমে ঢলে পড়ে এবং বস্তুর ছায়া স্পষ্ট হয়, তখন এর ওয়াক্ত শুরু হয়।
০০ তাৎপর্য :
০ এটি দিনের প্রথম সালাত যা আল্লাহর নবি ইব্রাহিম (আ.)-এর আমল থেকে ধারাবাহিকভাবে পরিচিত।
০০ হাদিস :
০ রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "যখন উত্তাপ বৃদ্ধি পায়, তখন সালাত ঠান্ডা করে আদায় করো, কেননা উত্তাপের প্রখরতা জাহান্নামের নিঃশ্বাসের অংশ।" (সহিহ বুখারি: ৫৩৮)।
০০ উপকারিতা :
০ শারীরিক : দীর্ঘক্ষণ কাজের পর দুপুরের দিকে মানুষের শরীরে অবসাদ আসে।
০ অজু ও সালাতের অঙ্গ সঞ্চালন শরীরকে রিফ্রেশ করে এবং কাজের ক্লান্তি দূর করে।
০ আত্মিক : সংসারের কাজের ব্যস্ততার মাঝে আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে দুনিয়ামুখী মনকে সোজা পথে আনে।
০০ করণীয় :
০ ওয়াক্ত হওয়ার পর ৪ রাকাত সুন্নত।
০ এরপর ইমামের সাথে ৪ রাকাত ফরজ।
০ ২ রাকাত সুন্নত এবং
০ সুযোগ থাকলে ২ রাকাত নফল আদায় করা।
৩। সালাতুল আসর।
০০ নামের রহস্য :
০ 'আসর' শব্দের অর্থ "সময়", "অপরাহ্ন" বা "নিষ্কাশন করা"।
০ দিনের আলো যখন ফুরিয়ে আসতে থাকে, তখন এই সালাত অনুষ্ঠিত হয়।
০০ তাৎপর্য :
০০ কুরআন :
০ কুরআনুল কারিমে এই সালাতকে 'সালাতুল উস্তা' বা মধ্যবর্তী সালাত হিসেবে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
০ "তোমরা সালাতসমূহের প্রতি যত্নবান হও, বিশেষ করে মধ্যবর্তী সালাতের।" (সূরা আল-বাকারা: ২৩৮)।
০০ হাদিস :
০ হাদিসে এসেছে, "যে ব্যক্তি আসরের সালাত অবহেলা বশত না পড়ে, তার আমল বিনষ্ট হয়ে যায়।" (সহিহ বুখারি: ৫৫৩)।
০০ উপকারিতা :
০ শারীরিক : বিকেলের সময়ে রক্তচাপ ও মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে আসরের সালাতের রুকু ও সিজদা বিশেষ সাহায্য করে।
০ আত্মিক : দিনের শেষভাগে কর্মব্যস্ততা ও কেনাকাটার ভিড়ে মানুষকে আল্লাহর জিকিরে ফিরিয়ে আনে।
০০ করণীয় :
০ সূর্য হলুদ বর্ণ ধারণ করার আগেই ৪ রাকাত ফরজ সালাত আদায় করা।
০ ফরজের পূর্বে ৪ রাকাত সুন্নাতে গায়রে মুয়াক্কাদাহ পড়াও উত্তম।
৪। সালাতুল মাগরিব।
০০ নামের রহস্য :
০ 'মাগরিব' শব্দের অর্থ "সূর্যাস্ত" বা "পশ্চিম দিক"।
০ সূর্য অস্ত যাওয়ার পর পরই এই সালাতের সময় শুরু হয়।
০০ তাৎপর্য :
হাদিস :
০ সূর্যাস্তের মধ্য দিয়ে দিন শেষ হয়ে রাতের আগমন ঘটে, যা মানুষকে জীবনের নশ্বরতা ও মৃত্যুর কথা মনে করিয়ে দেয়।
০ রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "আমার উম্মত ততদিন কল্যাণের ওপর থাকবে, যতদিন তারা মাগরিবের সালাত আদায়ে দেরি না করবে।" (সুনানে আবু দাউদ: ৪১৮)।
০০ উপকারিতা :
০ শারীরিক : সন্ধ্যার শুরুতে খাবারের পূর্বে অল্প বিরতি ও অজু-সালাত পরিপাকতন্ত্রকে রাতের খাবারের জন্য প্রস্তুত করে।
০ আত্মিক : সূর্যাস্তের মাধ্যমে এক দিনের বিদায় ও পরকালের প্রস্তুতির অনুভুতি জাগ্রত হয়।
০০ করণীয় :
০ ওয়াক্ত হওয়ার সাথে সাথে দেরি না করে ৩ রাকাত ফরজ সালাত আদায় করা এবং
০ এরপর ২ রাকাত সুন্নত আদায় করা।
৫। সালাতুল এশা।
০০ নামের রহস্য :
০ 'এশা' শব্দের অর্থ "রাতের প্রথম ভাগ" বা "অন্ধকার"।
০ সন্ধ্যার লালচে আভা সম্পূর্ণরূপে দূর হয়ে গাঢ় অন্ধকার নেমে আসলে এই সালাত আদায় করা হয়।
০০ তাৎপর্য :
হাদিস :
০ রাতের অন্ধকারে আলস্য ত্যাগ করে সালাতে দাঁড়ানো বড় ঈমানের পরিচয়।
০ রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "যদি তারা জানতে পারত যে এশা ও ফজরের সালাতে কী পরিমাণ সওয়াব রয়েছে, তবে তারা হামাগুড়ি দিয়ে হলেও এতে উপস্থিত হতো।" (সহিহ বুখারি: ৬১৫)।
০০ উপকারিতা :
০ শারীরিক : রাতের খাবারের পর সালাত আদায় করলে হজম প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয় এবং ভালো ঘুম হতে সাহায্য করে।
০ আত্মিক : সারাদিনের ভুলত্রুটি ক্ষমা চেয়ে পবিত্র অবস্থায় ঘুমানোর সুযোগ তৈরি হয়।
০০ করণীয় :
০ ৪ রাকাত ফরজ।
০ ২ রাকাত সুন্নত এবং
০ এরপর ৩ রাকাত বিতরের সালাত আদায় করা।
০ এশার সালাতের পর অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা না বলে দ্রুত ঘুমিয়ে পড়া রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ।
মহান রাব্বুল আলামিন আমাদের সবাইকে আমল করার তৌফিক দান করুন।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন