চলতি পথে ...
তালের পাখা প্রাণের সখা
বাতাস যেন মধু মাখা
আমি যখন ক্লান্ত হই
পাখা তখন প্রাণের সই
হ্যাঁ, প্রচণ্ড ভ্যাপসা গরমে তালের পাখার মধুমাখা পরশে কার না প্রাণ জুড়ায়? এই গরমে ঘরে-বাইরে, অফিসে কিংবা গাড়িতে যদি হাতের কাছে থাকে তালের পাখা তাহলে অন্তত কিছুটা হলেও স্বস্তি পাওয়া যায়। শহরের মানুষের তেমন একটা তালের পাখা ব্যবহার করতে দেখা না গেলেও গ্রাম-গঞ্জের মানুষের নিত্যসঙ্গী হচ্ছে লোকায়ত শিল্পের অন্যতম উপাদান তালের হাতপাখা। পথ চলতে ঘরে বাইরে যেকোনো স্থানে বৈদ্যুতিক পাখার পরিবর্তে তালের পাখার জুড়ি নেই। মানুষের ব্যবহারিক প্রয়োজনে অতি প্রাচীন কাল থেকেই পাখার প্রচলন হয়ে আসছে। হাজার বছর আগে মিসরীয় সম্রাট তুতেনখামেনের সময়কার সেই আদিমতম পাখাটি ছিল সোনার পাতে উটপাখির পালক জুড়ে তৈরি করা। মাত্র আড়াই দশক আগেও পোপের দু'পাশে কারুকার্যময় বিশাল পাখা বয়ে নেয়া হতো। তাছাড়া সেকালে রাজা-বাদশা, জমিদার-মহাজন ও পীর-দরবেশদের বাতাস করার জন্য বিশাল বিশাল পাখা ব্যবহার করা হতো। কিন্তু সেই প্রাচীন ইতিহাসকে পেছনে ফেলে বর্তমানে পাখায় এসেছে আধুনিকতার ছোঁয়া ও শিল্পীর নিপুণ আঁচড়। এখন তালের পাখার পাশাপাশি বিচিত্র রঙ ও কারুকার্যখচিত বেত, কাপড়, খেজুর পাতা, পাট ও বাঁশের তৈরি বিভিন্ন ধরনের হাতপাখা পাওয়া যায়। তবে এসব পাখার মধ্যে তালের পাখার কদরই সবচেয়ে বেশি। সাধারণত গ্রামের মহিলারা এসব পাখা তৈরি করে থাকে। তাল পাখা তৈরির ক্ষেত্রে প্রয়োজন পড়ে তাল পাতা, বাঁশের শলাকা, সুই-সুতা ও বিভিন্ন ধরনের রঙ। প্রথমে তাল পাতা রোদে শুকিয়ে নিতে হয়। তারপর কয়েক ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে রেখে পাতা নরম হলে গোলাকারভাবে কেটে বাঁশের শলাকা দিয়ে সুই-সুতায় বাঁধা হয়। এভাবেই তৈরি করা হয় তাল পাখা। পাখা তৈরি হলে মহিলারা বিভিন্ন রঙ ও হাতের কাজে কারুশিল্প ফুটিয়ে তোলে। কেউ কেউ পাখার ওপর 'ভুলো না আমায়', 'মনে রেখ', 'তাহার কথা মনে পড়ে,' 'আমি যদি পরী হইতাম', 'যাও পাখি বলো তারে', 'জল পড়ে পাতা নড়ে', 'প্রিয়ার সনে' প্রভৃতি কথা লিখেও মনের ভাব প্রকাশ করে থাকে। তাই দুঃসহ গরমে প্রাণের সখা নামে পরিচিত এসব পাখা আমাদের লোক সংস্কৃতিরও একটি অংশ বলা যায়। মসজিদের সিঁড়িতে বসে এক ব্যক্তির তালের পাখায় বাতাস করার এই দৃশ্যটি রাজধানীর মিরপুর থেকে ধারণকৃত।
ছবি: খোন্দকার এরফান আলী
(১৯ জুলাই, ২০২৬)
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন