আমি কি সফল? কুরআন কী বলে?
কুরআন শরীফ পড়তে পড়তে সূরা আল-মুমিনূনের শুরুর কয়েকটি আয়াতের প্রতি মন আটকে গেল। সফলতা সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা এমন কিছু বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন, যা আমাদের প্রচলিত সফলতার ধারণা থেকে বেশ ভিন্ন।
ভাবলাম, বিষয়টি আপনাদের সঙ্গেও শেয়ার করি।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ
“নিশ্চয়ই মুমিনরা সফল হয়েছে।” (সূরা আল-মুমিনূন: ১)
এরপরের আয়াতগুলোতে আল্লাহ তাআলা সেই সফল মুমিনদের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন।
১. নামাজে খুশূ ও বিনয়
الَّذِينَ هُمْ فِي صَلَاتِهِمْ خَاشِعُونَ
“যারা নিজেদের নামাজে বিনয়ী ও একাগ্র থাকে।” (সূরা আল-মুমিনূন: ২)
খুশূ (خشوع) বলতে নামাজে অন্তরের বিনয়, আল্লাহর প্রতি ভয় ও সম্মান এবং একাগ্রতাকে বোঝায়। নামাজে দাঁড়িয়ে শুধু শারীরিকভাবে নামাজের কাজগুলো সম্পন্ন করাই নয়, বরং অন্তরকেও আল্লাহর দিকে মনোযোগী রাখার বিষয়টি এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
বাস্তবে নামাজে দাঁড়িয়ে আমাদের মনে কত কিছুই না আসে! কখনো কাজের চিন্তা, কখনো ফোনের নোটিফিকেশন, কখনো দুনিয়ার নানা হিসাব। অথচ নামাজ হলো আল্লাহ তাআলার সামনে বান্দার উপস্থিতি। এই আয়াতটি পড়লে নামাজের বাহ্যিক আদায়ের পাশাপাশি অন্তরের একাগ্রতার বিষয়টিও বিশেষভাবে মনে আসে।
২. অনর্থক বিষয় থেকে বিমুখ থাকা
وَالَّذِينَ هُمْ عَنِ اللَّغْوِ مُعْرِضُونَ
“আর যারা অনর্থক বিষয় থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখে।” (সূরা আল-মুমিনূন: ৩)
এখানে اللَّغْوُ (লাগব) বলতে এমন অনর্থক কথা ও কাজ বোঝায়, যা পরিহার করা উচিত। এর মধ্যে পাপপূর্ণ কথাবার্তা ও কাজ যেমন অন্তর্ভুক্ত, তেমনি এমন ব্যস্ততাও রয়েছে, যা মানুষের সময় নষ্ট করে এবং কোনো কল্যাণ বয়ে আনে না।
বর্তমান সময়ে বিষয়টি নিয়ে ভাবার অনেক অবকাশ আছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটার পর একটা রিল দেখা, অপ্রয়োজনীয় বিতর্কে জড়িয়ে পড়া, গিবত ও পরচর্চায় সময় কাটানো কিংবা কোনো উদ্দেশ্য ছাড়াই ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফোন ব্যবহার করা—এসবের দিকে আমরা সহজেই অভ্যস্ত হয়ে পড়ি।
অবশ্যই প্রতিটি বিনোদন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার অনর্থক কিংবা নিন্দনীয় নয়। কিন্তু যখন এগুলো আমাদের মূল্যবান সময় গ্রাস করে এবং দ্বীন ও দুনিয়ার প্রয়োজনীয় কাজ থেকে গাফেল করে দেয়, তখন আয়াতটির তাৎপর্য নতুন করে ভাবার বিষয় হয়ে ওঠে।
৩. যাকাত আদায় করা
وَالَّذِينَ هُمْ لِلزَّكَاةِ فَاعِلُونَ
“আর যারা যাকাত আদায় করে।” (সূরা আল-মুমিনূন: ৪)
এখানে যাকাতের কথা এসেছে সফল মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে। যাকাত ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ ফরজ ইবাদত। নির্ধারিত শর্ত পূরণ হলে সম্পদের যাকাত আদায় করা আবশ্যক।
যাকাত শুধু সম্পদের একটি অংশ দিয়ে দেওয়ার বিষয় নয়; এর সঙ্গে সম্পদের পবিত্রতা, আল্লাহর নির্দেশের আনুগত্য এবং মানুষের হক আদায়ের সম্পর্ক রয়েছে। মানুষ সম্পদ উপার্জনের পেছনে অনেক শ্রম দেয়, কিন্তু সেই সম্পদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আল্লাহর নির্ধারিত অধিকার আদায় করাও যে সফল মুমিনের পরিচয়ের অংশ—এই আয়াত সেটিই স্মরণ করিয়ে দেয়।
৪. লজ্জাস্থানের হেফাজত করা
وَالَّذِينَ هُمْ لِفُرُوجِهِمْ حَافِظُونَ
“আর যারা নিজেদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে।” (সূরা আল-মুমিনূন: ৫)
আল্লাহ তাআলা সফল মুমিনের বৈশিষ্ট্য হিসেবে যৌন পবিত্রতা ও সংযমের কথা উল্লেখ করেছেন। পরবর্তী আয়াতগুলোতে বৈধ দাম্পত্য সম্পর্কের ব্যতিক্রম উল্লেখ করে সীমালঙ্ঘনকারীদের নিন্দা করা হয়েছে। (সূরা আল-মুমিনূন: ৫–৭)
বর্তমান সময়ে এই বিষয়টির প্রাসঙ্গিকতা সহজেই বোঝা যায়। ইন্টারনেট ও স্মার্টফোনের মাধ্যমে মানুষ খুব সহজে এমন সব বিষয়ের মুখোমুখি হয়, যা তার নৈতিকতা ও পবিত্রতার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাই শুধু প্রকাশ্য আচরণ নয়, নির্জনে থাকা অবস্থায়ও নিজের দৃষ্টি ও আচরণ সংযত রাখার গুরুত্ব এখানে স্মরণ করা যায়।
৫. আমানত ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা
وَالَّذِينَ هُمْ لِأَمَانَاتِهِمْ وَعَهْدِهِمْ رَاعُونَ
“আর যারা নিজেদের আমানত ও প্রতিশ্রুতির প্রতি যত্নবান থাকে।” (সূরা আল-মুমিনূন: ৮)
আমানত বলতে শুধু কারও কাছে গচ্ছিত রাখা অর্থ বা সম্পদ বোঝায় না। মানুষের ওপর অর্পিত দায়িত্ব এবং অন্যের অধিকারও আমানতের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। আর عهد (আহদ) বলতে অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি বোঝায়।
পারিবারিক জীবন, ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি কিংবা সামাজিক সম্পর্ক—প্রতিটি ক্ষেত্রেই এই গুণের প্রয়োজন। কারও গোপন কথা রক্ষা করা, নিজের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা, লেনদেনে সততা বজায় রাখা এবং প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা—এসবই এই গুণের বাস্তব উদাহরণ।
এখানে লক্ষণীয়, আল্লাহ তাআলা সফল মুমিনের পরিচয় দিতে শুধু নামাজ ও অন্যান্য ইবাদতের কথা বলেননি; মানুষের সঙ্গে তার আচরণ ও দায়িত্বশীলতার কথাও উল্লেখ করেছেন।
৬. নামাজের হেফাজত করা
وَالَّذِينَ هُمْ عَلَىٰ صَلَوَاتِهِمْ يُحَافِظُونَ
“আর যারা নিজেদের নামাজসমূহের হেফাজত করে।” (সূরা আল-মুমিনূন: ৯)
এই আয়াতের মাধ্যমে সফল মুমিনের বৈশিষ্ট্যগুলোর বর্ণনা শেষ হয়েছে। এখানে নামাজের হেফাজত করার কথা বলা হয়েছে—অর্থাৎ নামাজকে নিয়মিত গুরুত্ব দেওয়া, তার নির্ধারিত সময় ও বিধিবিধান রক্ষা করা এবং অবহেলা থেকে বেঁচে থাকা।
লক্ষ করার মতো বিষয় হলো, এই বৈশিষ্ট্যগুলোর বর্ণনা শুরু হয়েছে নামাজে খুশূর কথা দিয়ে, আর শেষ হয়েছে নামাজের হেফাজতের কথা দিয়ে। প্রথমটিতে নামাজের অন্তর্গত অবস্থা, আর শেষটিতে নামাজের প্রতি নিয়মিত যত্নের বিষয়টি সামনে এসেছে।
এভাবে সূরার শুরুতেই নামাজ, ব্যক্তিগত পবিত্রতা, আমানতদারি ও জীবনাচরণের বিভিন্ন দিক একসঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে।
### এই গুণগুলোর প্রতিদান কী?
আল্লাহ তাআলা বলেন—
أُولَٰئِكَ هُمُ الْوَارِثُونَ الَّذِينَ يَرِثُونَ الْفِرْدَوْسَ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ
“তারাই উত্তরাধিকারী। তারা ফিরদাউসের উত্তরাধিকারী হবে; সেখানে তারা চিরকাল থাকবে।” (সূরা আল-মুমিনূন: ১০–১১)
এখানে আল্লাহ তাআলা এই বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন মুমিনদের জন্য জান্নাতুল ফিরদাউসের সুসংবাদ দিয়েছেন। দুনিয়ার সফলতা সাধারণত সম্পদ, সামাজিক মর্যাদা ও অর্জনের মাধ্যমে পরিমাপ করা হয়। কিন্তু কুরআনের এই আয়াতগুলোতে সফলতার সঙ্গে ঈমান, ইবাদত, পবিত্রতা ও উত্তম চরিত্রের সম্পর্ক স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।
এরপরের আয়াতগুলোতে আল্লাহ তাআলা মানুষের সৃষ্টির বিভিন্ন পর্যায়, মৃত্যু এবং পুনরুত্থানের কথা উল্লেখ করেছেন। (সূরা আল-মুমিনূন: ১২–১৬)
কুরআন তিলাওয়াত করতে গিয়ে এই আয়াতগুলো পড়ে সফলতা সম্পর্কে বিষয়টি আমার কাছে বিশেষভাবে ভালো লেগেছে। তাই আয়াতগুলোর অর্থ ও কিছু প্রাসঙ্গিক ভাবনা একসঙ্গে সাজিয়ে শেয়ার করলাম।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন